করোনা মহামারী: গৃহবন্ধীর দিনগুলি

মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের আতঙ্কে রয়েছে গোটা বিশ্ব। সেই তালিকা থেকে বাদ পড়েনি বাংলাদেশও। গত বছরের শেষের দিকে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের থাবায় স্থবির হয়ে পড়েছে সারাবিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। প্রাণঘাতি এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশই লকডাউন ঘোষণা করেছে। আমাদের দেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয় ৮ই মার্চ এবং সরকার সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করে ২৬ই মার্চ। একেএকে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানই বাসায় বসে অফিসের কাজ করার নীতি গ্রহণ করে। শুরু হয় গৃহবন্ধী জীবন। একটি বেসরকারি ধাতব্য সংস্থায় আমার কর্মস্থল। সারাদিন বাসায় বসে ফোনকল আর ইন্টারনেটের সাহায্যেই মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে অফিসে আপডেট করতে হয়। আর বাকি সময় কাটে পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে করোনাভাইরাসের খোঁজখবর রেখে। এভাবে সপ্তাহ পার না হতেই মেজাজ খিটখিটে হতে শুরু করে, বাড়তে থাকে উদ্বেগ। বিষণ্ণতায় চোখ ভিজে আসে, নৈরাশ্য ভর করে। তীব্রতর হতে শুরু করে মন খারাপের মাত্রা। একদিন সকালবেলা উঠে ভাবতে শুরু করি কাজের ফাঁকেফাঁকে বাকি সময়টাকে কিভাবে উপভোগ্য করে তোলা যায়। দিনের শুরু হয় সকালের নাস্তা সেরে বইপড়া দিয়ে। খেয়াল করলাম পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের খবরে সময় কম দিয়ে বই পড়ার নেশা বাড়ার সাথেসাথে মন থেকে অস্থিরতা হ্রাস পেতে শুরু করে। এই একদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করি নতুন নতুন কৌশলে প্রতিদিনের অলস সময়গুলোকে অতিবাহিত করার উপায়। গৃহবন্ধীর দিনগুলিতে আমি যেভাবে প্রত্যেকটি দিনকে আনন্দময় করে তোলার উপায় খুঁজেছি সেগুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমার এই লেখায়-
১. পরিবারকে সময় দেয়াঃ করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে যখন একমাত্র ঘরে থাকাই হলো বড় প্রতিরোধ যুদ্ধ, তখন নিঃসঙ্গতাকে দূর করতে শুরু করি পরিবারকে বেশিবেশি সময় দেয়া। সপ্তাহে ছয়দিন অফিস থাকায় আগে পরিবারকে তেমন সময় দেয়া হতো না। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে যখন বাসায় বসে কাজের সুযোগ হল তখন পরিবারের সবার সাথে সময় ভাগাভাগি করার একটা সুযোগ তৈরি হল। করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া স্বাস্থ্য পরামর্শগুলো পরিবারের সবার সাথে শেয়ার করে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে উৎসাহিত করি। সদ্য বিবাহিত জীবনে নতুন একটি পরিবারে এসে সবার সাথে ভালভাবে মেশার সুযোগ হয়ে ওঠে লকডাউনের এই সময়টা। পারিবারিক সম্পর্কের নানান বিষয়ে সবার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়। পেছনের কারণটা কিন্তু করোনাভাইরাসই। তাই এই ভাইরাসকে যত অভিশাপই দিই না কেন, ঘরে থাকার সমসয়টা কিন্তু এরই কারণে। এটাই পরিবারের সাথে নিজের মতো করে সময় কাটানোর সুবর্ণ সুযোগ।
২. বই পড়াঃ বইয়ের থেকে ভাল বন্ধু আর কে হতে পারে? হোক সেটা গল্পের বই কিংবা একাডেমিক। এই বন্ধের সময়টুকুতে ইংরেজি সাহিত্যের বই ও বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাস বিষয়ে কিছু বই পড়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করেছি। উল্লেখ করা যেতে পারে প্রথম আলোর নিয়মিত কলামিস্ট মহিউদ্দিন আহমদের রাজনীতি বিষয়ক- জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি বইটির কথা। এ বইটিতে ৪৭ সালের ভারতভাগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তি ইতিহাস ও অভ্যুত্থান দারুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বইটি পড়ে ভাল সময় পার করেছি এবং দেশের সমসাময়িক রাজনীতি বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পেরছি।
৩. বন্ধুদের খোজ নেয়াঃ কর্মব্যস্ততার কারণে বন্ধুদের খোঁজ খবর নেয়া হয়ে ওঠে না। যার কারণে প্রায় সময় বন্ধুদের কাছ থেকে নানা অনুযোগ অভিযোগ শুনতে হয়। অনেকের সাথে কালেভদ্রেও কথা হতো না। এখন হাতে অনেক সময়। তাই ফোনকলের পাশাপাশি ম্যাসেঞ্জার, ইমু, ভাইবারের মাধ্যমে বন্ধুদের খোঁজখবর নিই। মাঝেমাঝে ভিডিওকলে একসাথে অনেকে আড্ডা দিয়েছি। কথা হয়েছে অনেক পুরোনো বন্ধুদের সাথে। যার ফলে বন্ধুদের সাথে নতুন করে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠেছে।
৪. বাসার কাজে অন্যদের সময় দেয়াঃ বাসার কাজে সময় দেয়ার মোক্ষম সুযোগ তৈরি হয় বন্ধের দিনগুলিতে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নানান কাজে একটু আধটু সহযোগিতা করেছি। এই সময়টাতে পরিবারের প্রায় সব সদস্য বাসায় থাকাতে দৈনন্দিন কাজগুলো সকলে মিলে অনেক কম সময়ে করতে পেরেছি। এতে করে প্রতিদিন বাসার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
৫. বাড়িঘর ঘোছানো ও আঙ্গিনা পরিষ্কার করাঃ ঘর ঘোছানো থাকলে একধরনের প্রশান্তি অনুভব করা যায়। তাই প্রতিদিন কিছু সময় কাটিয়েছি ঘর ঘোছানোর মাধ্যমে। কাপড়্গুলো জায়গামত গুছিয়ে রাখা। বাসার আসবাবপত্রগুলো মুছে নতুন করে পরিপাটি করে রাখার কাজ করেছি। আমার দেখাদেখিতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও যে যারযার মত করে নিজের রুম পরিষ্কার করেছে। সপ্তাহে একবার জীবানুনাশক দিয়ে ঘনঘন হাত দেয়া হয় সে জিনিসগুলো জীবানুমুক্ত করেছি।
৬. বাসার ছোট বাচ্চাদের লেখাপড়ায় সময় দেয়াঃ বাসায় ছোট বাচ্চারা আছে। সরকার ঘোষিত লকডাউনের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে। যার ফলে বাচ্চাদের শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। টিভিতে এবং অনলাইনে সরকারি নির্দেশনায় বাচ্চাদের জন্য পাঠদান অব্যাহত থাকলেও তা বাচ্চারা যথাযতভাবে আয়ত্ব করতে পারছে না। তাই যতটুকু পেরেছি বাচ্চাদের পড়াশুনায় সময় দেয়ার চেষ্টা করেছি। টিভিতে এবং অনলাইনে প্রচারিত ক্লাসগুলো যেন তারা বুঝতে পারে সেদিকেও খেয়াল রাখার চেষ্টা করেছি। তাছাড়া পরিবারের কোন সদস্যদের কাছ থেকে পড়তে পারলে বাচ্চাদের মানসিক বিকাশ সাধন হয় বলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি।
৭. আত্নীয়-স্বজনের সাথে যোগাযোগ করাঃ কর্মব্যস্ততায় প্রিয়জন কিংবা আত্নীয় স্বজনের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সাহায্যে দূরদূরান্তের বন্ধুবান্দবের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা গেলেও নিকটতম আত্নীয় স্বজনের সাথে তেমন হয় না। তাই এই সময়টাকে কাজে লাগিয়েছি। কাছের ও দূরের অনেক আত্নীয় স্বজনের খোঁজ খবর নিয়েছি। এই সময়টাতে আত্বীয়তার সম্পর্কেগুলোকে আবার নতুনভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।
৮. কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা বাড়ানঃ বিভিন্ন সময় অফিসের কাজ করতে গিয়ে কম্পিউটারে কিছু বিষয়ে বেশ বেগ পেতে হয়। তাই এই অবসর সময়ে কিছু সময় দিয়েছি কম্পিউটার ব্যবহারের এই দূর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে। ইউটিউবের টিউটোরিয়াল দেখে দেখে মাইক্রোসফট অফিস প্যাকেজের নানা কুটিনাটি বিষয়গুলো শেখার চেষ্টা করেছি। এক্সেল এবং পাওয়ারপয়েন্টের কিছু কাজও শেখার চেষ্টা করেছি। যার কারণে এক ধরণের আত্নবিশ্বাস তৈরি হয়েছে নিজের মাঝে।
৯. নতুন নতুন নাস্তা তৈরি ও রান্না করাঃ কাজের চাপে বেশিরভাগ দিনই নিজের হাতে রান্না-খাওয়া হয়ে ওঠে না। তাই মাঝেমাঝে চেষ্টা করেছি নতুন নতুন নাস্তা তৈরি করতে। বৈচিত্র আনার জন্য ইউটিউবে নাস্তা তৈরির রেসিপি দেখেছি। যদিও লকডাউনের কারণে বাজারে গিয়ে সব ধরনের উপকরণ পাওয়াটা কষ্টকর ছিল, তারপরও যা পেয়েছিলাম তাতেই ভালভাবে কাজ সারতে পেরেছিলাম। নাস্তার পাশাপাশি কিছু নতুন রেসিপির রান্না করার চেষ্টাও করেছি। এভাবে কিছু সময় দিয়েছি নাস্তা তৈরি ও রান্নার কাজে।
১০. মজার মজার গেমস খেলাঃ মাঝেমাঝে কিছু মজার মজার গেমস খেলে সময় কাটানোর চেষ্টা করেছি। পরিবারের কয়েকজন মিলে একসাথে লুডু খেলেছি। আবার অনলাইনেও বন্ধুদের সাথে লুডু খেলে সময় কাটিয়েছি। কিছু নতুন নতুন গেমস ডাউনলোড করেছি। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের অন্যতম সংযোজন ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে একাএকা এবং মাঝেমাঝে বন্ধুদের সাথে নতুন নতুন গেমস খেলেছি।
১১. টিভিতে ভালো প্রোগ্রামগুলো দেখাঃ করোনামহামারীর সময়ে কোনটি করা উচিৎ আর কোনটি অনুচিত সেই বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। তাই করোনাভাইরাস বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে টিভিতে সম্প্রচারিত স্বাস্থ্য বিষয়ক ভালো ভালো প্রোগ্রামগুলো দেখার চেষ্টা করেছি। করোনাভাইরাস সংক্রান্ত খবরের পাশাপাশি বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বাজার পরিস্থিতিসহ অন্যান্য খবরাখবরও দেখেছি। বাসার বাচ্চাদের সাথে বসে বিভিন্ন শিশুতোষ ও শিশুশিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখেছি। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত অনেক পুরোনো নাটক-সিরিয়াল দেখেছি। এছাড়া সিয়াম সাধনার মাস রমজান শুরু হওয়ায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো দেখার চেষ্টা করেছি। এভাবে নানারকম প্রোগ্রাম দেখে সময় কাটানোর চেষ্টা করেছি।
১২. শরীর চর্চা করাঃ কর্মব্যস্ততা আর পরিবারের নানা কাজের কারণে শরীর চর্চাতে খুব একটা সময় দেয়া যেত না। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে গৃহবন্ধী থাকার কারণে প্রতিদিন কিছুটা সময় শরীর চর্চার জন্য ব্যয় করতে পেরেছি। তাছাড়া করোনাভাইরাসসহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা শরীর চর্চার মাধ্যমে ইউমিনিটি সিস্টেমকে ডেভেলপ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাই প্রতিদিন সকাল-বিকাল হালকা হাঁটাহাঁটির মাধ্যমে শরীর চর্চার চেষ্টা করেছি। যেহেতু এই সময় বাড়ির বাইরে যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই পার্ক কিংবা খোলা মাঠে না গিয়ে বাড়ির আঙিনার মাঝখানের খোলা জায়গায় নিয়মিত শরীর চর্চা করেছি। শুধু নিজে ব্যায়াম না করে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ব্যায়াম করার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছি।
১৩. শাকসবজি চাষ করাঃ কাজের ফাকে অবসর সময়ে কিছু সময় দিয়েছি গার্ডেনিংয়ের কাজে আর শাকসবজি রোপন করে। বাড়ির আঙ্গিনায় ছোট পরিসরে বিভিন্ন রকমের শাকসবজি লাগিয়েছি। নিয়মিতভাবে পানি ও সার দিয়ে পরিচর্যা করেছি। গত দুই মাসের পরিচর্যায় প্রায় সবজি ধরার উপযুক্ত পর্যায়ে এসেছে। এছাড়া বাড়ির আঙ্গিনায় কিছু ফুলের গাছও লাগিয়েছি যাতে করে বাড়ির সামনের অংশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। অনেকদিন পর বুঝতে পেরেছি শাকসবজির চাষাবাদ ও তা পরিচর্যার মাধ্যমে এক অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করা যায়।
লকডাউনের এই দিনগুলিতে যাদের সময় কোনভাবেই কাটে না তাদের জন্য আমার পরামর্শ হল, শুধুশুধু অলস সময় না কাটিয়ে আপনারাও চাইলে আপনাদের অলস সময়গুলোকে আনন্দময় করে তুলতে পারেন। অলসতা শরীর ও মন দুটোকেই অসুস্থ করে তোলে। তাই মনের শান্তি ও সুস্থতার জন্য বন্ধের দিনগুলিতে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা আগের দিন রাতেই তালিকা তৈরি করে ফেলতে পারেন পরের দিন কি কি কাজ করে সময় কাটাবেন। এতে করে আপনি একদিকে মানসিক তৃপ্তি অনুভব করবেন, অন্যদিকে আপনার বাড়ির অনেকগুলো কাজও করা হয়ে যাবে। আপনার মনেই হবে না আপনি লকডাউনে আছেন।
লেখকঃ হুমাইরা মর্জিয়া লাকি
MSc in Geography & Environmental Science
Development Worker
ইমেইলঃ [email protected]

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন