

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্ট মার্টিন দ্বীপে অব্যাহত স্থাপনা নির্মাণের মুখে গতকাল মঙ্গলবার আরো এক দফায় অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ দফায় নির্মাণাধীন ইট কংক্রিটের আরো দুটি পাকা রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে সব নির্মাণসামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। দ্বীপের দিয়ার মাথা নামক স্থানে মিশন গ্রুপের নির্মাণাধীন বিশাল স্থাপনায় অভিযান চালিয়ে একজনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক বলে জানা গেছে।
দ্বীপের দিয়ার মাথার পাঁচ একর জমিজুড়ে সিন্দবাদ নামের বিশাল রিসোর্ট এলাকাটির মালিকানার পরিচয় এত দিন গোপন রাখা হয়েছিল। কেউই মুখ খোলেনি সিন্দবাদ রিসোর্টের মালিকানার আসল পরিচয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এটির প্রকৃত মালিক মিশন গ্রুপ।
এ ছাড়া দ্বীপের নৌঘাটসহ আরো কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী। এই সামগ্রী নৌকায় তোলার কাজ চলছে। দ্বীপ থেকে নির্মাণসামগ্রীগুলো টেকনাফের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসা হবে। যাতে নতুন করে সেখানে নির্মাণকাজ করার সুযোগ না থাকে।
টেকনাফের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইরফানুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দ্বীপের বাজারের ভেতরেই রাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্মাণ করা হচ্ছিল দুটি রিসোর্ট। খবর পেয়ে রিসোর্ট দুটিতে অভিযান চালিয়ে সব নির্মাণসামগ্রী জব্দ করে ফেলি। কাদের রিসোর্ট নামের একটির দোতলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করা হচ্ছিল। অন্যটির নির্মাণকাজও বেশ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। সব স্থাপনাই অবৈধভাবে করা হচ্ছিল।’
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দ্বীপের বাজার এলাকায় চলাচলের রাস্তা দখল করে দোকানের মালপত্র রাখায় তিনজন মুদি দোকানিকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। দ্বীপের নৌঘাটে স্তূপ করাসহ আরো বেশ কয়েকটি স্থানের অবৈধ নির্মাণসামগ্রী জব্দ করে নৌকায় তুলে টেকনাফের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালত সন্ধ্যায় দ্বীপের দক্ষিণ দিকে ছেঁড়াদ্বীপের উত্তরে দিয়ার মাথা নামক স্থানে অভিযানে যান। সেখানে নির্মাণাধীন রয়েছে ৫ একর বনভূমি জুড়ে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সমৃদ্ধ এলাকাটির প্রবাল পাথর তুলে রিসোর্টে যাতায়াতের রাস্তাও করা হয়েছে। রিসোর্ট এলাকার সামনে বনের গাছ কেটে তুন করে পাকা পিলার দিয়ে একটি পাকা ভবনের কাজ চলছে। কিন্তু ভেতরে গিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেখতে পান আরো ৫টি রিসোর্ট সদ্য নির্মিত রয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক রিসোর্টেও ম্যানেজারকে আটক করেন।
অভিযোগ উঠেছে, দ্বীপের পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন এতদিনেও সেখানে কোনো অভিযান পরিচালনা করেননি। তবে গত শনিবার সেখানে গিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ওই স্থাপনার জন্য এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। ৫ একর জুড়ে ওই রিসোর্টেও নাম সিন্দবাদ এবং মালিকের নাম রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলে পরিবেশকর্মীরা জানিয়েছিলেন।
গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবে বিশাল এলাকাটির মালিক হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ব্যক্তিদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মিশন গ্রুপ। যে প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য পরিচালানার দায়িত্বে ছিলেন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলী। সন্ধ্যা নেমে আসায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান স্থগিত করে আজ বুধবার ওই এলাকাটিতে অভিযান পরিচালনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) একটি উচ্চ পর্যায়ের দলও বৃহস্পতিবার সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ বিধ্বংসী স্থাপনাগুলোর বিষয়ে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে সরেজমিন দ্বীপ পরিদর্শনে যাচ্ছে। কউক সচিব আবু জাফর রাশেদ জানান, যে কোনোভাবে পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে দ্বীপটিকে রক্ষা করতে হবে।
টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরী জানান, দ্বীপের কোনো স্থাপনা নির্মাণে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনকি নির্মাণ সামগ্রী নিতেও কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীরা গোপনে টেকনাফ থেকে দ্বীপে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে যায়।

পাঠকের মতামত