প্রকাশিত: ১৬/০৮/২০২১ ৯:০৬ এএম

প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে মানবিকতার এক অনবদ্য উদাহরণ স্থাপন করেছে, যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এত সংখ্যক অতিরিক্ত মানুষের দায়িত্ব নেওয়া ও তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শরণার্থী প্রতিরক্ষা বিষয়ে এর আগে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোর ঐকমত্যে যে সনদ ও প্রস্তাবনাগুলো গৃহীত হয়েছিল, তা সে সময়ে ব্যবহার্য হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্রমাগত পরিবর্তনে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর কার্যকারিতা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আন্তর্জাতিক মহল ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বিবেচনা করে এমন নীতি-বিধান গ্রহণ করার সময় এসেছে, যা বর্তমানের এই রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে উপযোগী হবে। গত বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এই অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। এটি ছিল রোহিঙ্গা বিষয়ে সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (সিএফআইএসএস) আয়োজিত চতুর্থ ওয়েবিনার।

‘মানবিক আদর্শ, জাতীয় নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি’ শীর্ষক এই ওয়েবিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস এম আলী আশরাফ। সঞ্চালক ছিলেন সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল ও স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সভাপতি কমডোর (অব.) মোহাম্মদ নুরুল আবছার। ওয়েবিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে কমডোর (অব.) আবছার বলেন, রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, তা করেছে। কিন্তু এত বিশাল একটি জনসংখ্যা, যা এমনকি পুরো ভুটানের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি, এর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশের পক্ষে নেওয়া আর সম্ভব নয়। বাংলাদেশের এই পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক মহল থেকে যে প্রশংসা এসেছে, তা অবশ্যই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যকে প্রতিফলিত করে। কিন্তু সময় এসেছে যে এই মহলকেই এখন এই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে। এই উদ্দেশ্যে তিনি সামগ্রিক চিত্রটি সব দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে একটি টেকসই সমাধানে আসার আহ্বান জানান।

আলোচনার অংশ হিসেবে ড. আলী আশরাফ একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। এতে তিনি শরণার্থী গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশগুলোর শরণার্থী নীতিমালায় মানবিক আদর্শ ও জাতীয় নিরাপত্তা- এ দুটি বিষয়ের ভারসাম্য যাচাই করেন এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপারটি বিবৃত করার চেষ্টা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরকে আশ্রয় প্রদান করে থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে নিয়মমাফিক পর্যালোচনা, শরণার্থী সূচক নীতিমালা গ্রহণ, এ বিষয়গুলোর কার্যকারিতা ও এর পেছনের প্রভাবকগুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত পর্যায়ে গবেষণা প্রয়োজন। স্বাগতিক দেশের সূচকগুলো মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে হয়- আইনি ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া, আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থাগুলোর প্রতি মনোভাব এবং আশ্রয়প্রার্থীদের গ্রহণ ও তাদের সঙ্গে প্রতি আচরণ। এ তিনটি বিষয়ের ভিত্তিতে তিনি অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় বিশ্নেষণ করেন এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতিমালা প্রবর্তনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন। এরপর তিনি শরণার্থী গ্রহণের পেছনে তার গবেষণাপত্রে তাত্ত্বিক বিবেচনায় যে মূল দুটি বিষয় উদ্ভাবন করেছেন, সেগুলো আলোচনা করে তার সঙ্গে বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটের ধারাবাহিকতা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যারা লিবারেল-তত্ত্বে বিশ্বাসী, তাদের মতে মানবতাই হচ্ছে এই শরণার্থীদের গ্রহণ করে নেওয়ার মূল কারণ এবং আশ্রয় প্রদানকারী দেশে তাদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে শরণার্থী প্রবাহ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার এ মতবাদই অনুসরণ করেছে এবং সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদের জীবনযাপন এখানে সহনীয় করে তুলেছে। কিন্তু বাস্তববাদীদের মতে, এখন বাংলাদেশের উচিত নিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করা। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্প গড়ে ওঠার ফলে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার অনেকটা অবনতি ঘটেছে এবং এদের মাধ্যমে মানব পাচার ও মাদক চোরাচালানের শঙ্কা, এমনকি উগ্রপন্থিদের জাগরণের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার এসব প্রতিরোধে সব ব্যবস্থা নিচ্ছে, উন্নয়নের এ পর্যায়ে এসে এই অযাচিত দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়।

ড. আলী আশরাফ বলেন, এই পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য একমাত্র সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন। ২০১৭ সালের বৃহদাকারে শরণার্থী প্রবেশ ও তাদের আশ্রয় প্রদানের পেছনে মানবিক দিকটি ছাড়াও ধর্মীয় সম্প্রীতি, আন্তর্জাতিক সংস্থার চাপ, ভূ-কৌশলগত ইত্যাদি বিষয় কাজ করা সত্ত্বেও এখন আমাদের অনুধাবন করতে হবে, আমাদের সাহায্য প্রদানের সামর্থ্য আর নেই। এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব যে কোনো মূল্যে কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে মিয়ানমারকে তাদের মানুষদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করা।

আলোচনা শেষে ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের কাছ থেকে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে আসে, যা এ সেশনকে আরও বর্ধিত করে তোলে। প্রশ্নের মাধ্যমে এ বিষয়ে চীন, ভারত ও জাপানের অবস্থানের প্রতিক্রিয়া, কোয়াডের মাধ্যমে পশ্চিমা দেশে ও বিআরআইর মাধ্যমে চীনের স্বার্থ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক দ্বারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী বসবাসের প্রস্তাবনা, স্বাগতিক দেশের শরণার্থী স্থানান্তর বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার হস্তক্ষেপ, ভাসানচর প্রকল্পসহ এমন আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এসবের উত্তরে প্রধান বক্তা ড. আলী আশরাফ ও সঞ্চালক কমডোর (অব.) আবছার বারবার উল্লেখ করেন, এই সংকটের একমাত্র সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মিয়ানমারে সফল প্রত্যাবর্তন এবং তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এ বিষয়ের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট দেশগুলো প্রতি তাদের ভূ-কৌশলিক স্বার্থকে আলাদা রেখে একমাত্র মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে চিন্তা করার আহ্বান জানান। তারা মনে করিয়ে দেন, যদি সবাই মিলে এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে মিয়ানমারকে একটি সমঝোতাপূর্ণ আলোচনায় আসতে বাধ্য না করা হয়, তবে প্রকৃতপক্ষে এমন একটি কাজকে বৈধতা দেওয়া হবে, যাকে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ‘জাতিগত নির্মূলীকরণের যথার্থ সংজ্ঞা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ-চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে রোহিঙ্গা ও করিডোর নিয়ে আলোচনা

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ক‌রে‌ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, পরিবহন ...

ইউপি চেয়ারম্যানের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক করতে হাইকোর্টের রুল

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক নিশ্চিতে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ...

মিয়ানমারের নতুন বাস্তবতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মধ্যস্থতা করবে চীন

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি ...

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল কমিটি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ১১ সদস্যের ‘রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করেছে সরকার। ...
Single Page Footer