কক্সবাজারে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই চলছে অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল,ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলার তালিকাভুক্ত ১৮০টি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লাইসেন্স নবায়ন করেছে মাত্র ২৫টি। দীর্ঘদিন লাইসেন্স নবায়ন না করেই চিকিৎসাসেবা চালানোর পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুমোদিত বেডের অতিরিক্ত রোগী ভর্তি,২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক-নার্স না রাখা,অস্ত্রোপচারে প্রশিক্ষিত জনবল না থাকা এবং পার্কিংসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নানা শর্ত না মানার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপের সুযোগে বেসরকারি খাতে এমন অনিয়ম চললেও কার্যকর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রোগী ও স্বজনরা। কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী,জেলায় তালিকাভুক্ত বেসরকারি হাসপাতাল,ক্লিনিক,ডায়াগনস্টিক সেন্টার,ডেন্টাল ও মেডিকেল চেকআপ সেন্টার রয়েছে ১৮০টি। এর মধ্যে হাসপাতাল ও ক্লিনিক ৪৫টি,ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১১৭টি,ডেন্টাল ক্লিনিক ১০টি,ফিজিওথেরাপি সেন্টার একটি এবং মেডিকেল চেকআপ সেন্টার রয়েছে সাতটি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লাইসেন্স নবায়ন করেছে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠান। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বশেষ নবায়ন বিভিন্ন আগের অর্থবছরে করা হয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের নবায়ন তালিকায় ২৫টি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়নি। ১০ উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার জেলার ২০২৪ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ২৮ লাখ ২৩ হাজার ২৬৬ জন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবায় ২৫০ শয্যার একটি সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ থাকায় বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এই সুযোগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর তদারকি ও নিয়মিত অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছে রোগী ও স্বজনরা। জেলা শহরের হাসপাতাল সড়ক এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে,স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টা একজন ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ও নার্স থাকার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে তা নেই। অনুমোদিত বেডের সংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি। অস্ত্রোপচার কক্ষে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবলের পরিবর্তে আয়া ও ওটি বয় দিয়ে বিভিন্ন কাজ করানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের কিছু সময় আগে চিকিৎসককে হাসপাতালে ডেকে আনার অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতাল সড়ক এলাকায় গ্রাম থেকে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষকে টার্গেট করে বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকের নাম বলে রোগীদের নিয়ে যাওয়া হয়। প্রকাশ্যে এমন কর্মকাণ্ড চললেও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। হ্নীলা এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম তার স্ত্রী শরিফা আক্তারকে সন্তান প্রসবের জন্য চেইন্দা হোপ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে চিকিৎসার পর শরিফার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। পরে তাকে ইউনিয়ন হাসপাতালে নেওয়া হলে জরায়ু কেটে ফেলতে হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি,চিকিৎসায় ভুলের বিষয়টি নিয়ে পরে সমঝোতার মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও চলেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আরেকটি বড় সমস্যা পার্কিং। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সামনে রোগী বহনকারী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে হাসপাতালমুখী গাড়ি সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। হাসপাতাল নির্মাণের সময় পার্কিংয়ের জায়গা দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হলেও পরে সেই জায়গায় ফার্মেসি,দোকান ও চিকিৎসকের চেম্বার তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়। টেকনাফ থেকে প্রাইভেটকারে রোগী নিয়ে জেলা শহরে আসা শাহেদ করিম বলেন,প্রাইভেটকারটি কোথায় পার্ক করব,সেই ব্যবস্থাও নেই। স্টেডিয়ামের সামনে গাড়ি রেখে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন হাসপাতাল,ফুয়াদ আল খতীব,একেএস,সেন্ট্রাল হাসপাতাল,জেনারেল হসপিটাল,সি-সাইড,শেভরন,সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার,সিআইসি,ডিজিটাল,ন্যাশনাল,মা ও শিশু,প্রিমিয়ার মেডিকেল সেবাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে একই চিত্র দেখা যায়। এ বিষয়ে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন,জেলার সব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। যাদের লাইসেন্স নবায়ন বা লাইসেন্স নেই,তাদের দ্রুত লাইসেন্স নবায়ন ও লাইসেন্স করতে বলা হয়েছে। যারা লাইসেন্স ছাড়াই চলছে বা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেনি,তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে চলছে না,সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন,হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার বিষয়ে ইতোমধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। সম্প্রতি শহরের ফুয়াদ আল খতীব হাসপাতাল ও সি-সাইড হাসপাতালে গিয়ে পার্কিংসহ নানা অসঙ্গতি পাওয়া যায়। বাকিগুলোও তদন্ত করে বিধিমতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন,লাইসেন্স নবায়ন ছাড়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাঠকের মতামত