
ওমর ফারুক, উখিয়া::
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা স্থানীয় ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত একটি এলাকা। এখানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় এনজিও কার্যক্রম এবং জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত ঘটে। তবে এই স্বাভাবিক চলাচলের পথেই এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যাত্রী হয়রানি, বিশেষ করে সড়ক পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ।
উখিয়ার উত্তরাংশ-কোর্টবাজার, মরিচ্যা থেকে কক্সবাজারমুখী সড়কে তুলনামূলকভাবে ভাড়া কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলে চিত্র ভিন্ন। কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী ও পালংখালী এলাকায় সিএনজি চালকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ যাত্রীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
শুধু সাধারণ যাত্রীই নয়, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও এই সমস্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উখিয়া কলেজে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা আগে পালংখালী থেকে কলেজে আসতাম ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে, এখন সেটি বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। অথচ এই ৬০ টাকায় বাসে করে কক্সবাজার পর্যন্ত যাওয়া যায়। আমরা শিক্ষার্থী-একদিকে কলেজ ফি, অন্যদিকে বাড়তি যাতায়াত খরচ। পরিবারেও আর্থিক চাপ থাকে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, এমনকি অনেকে বাধ্য হয়ে কর্মজীবনে চলে যেতে পারে।”
অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কুতুপালং বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, “এই বাজারটি এখন রাজধানীর মতো ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ভোর সকাল থেকেই বেচাকেনা শুরু হয়। উপজেলা প্রশাসন অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করায় কিছুটা যানজট কমেছে ঠিকই, কিন্তু কিছু বেপরোয়া গাড়িচালকের কারণে এখনও প্রায়ই জ্যাম সৃষ্টি হয়। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে চালকদের প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক, এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে-যা এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত এনজিও কর্মীরাও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, নির্ধারিত ভাড়া নিয়ে বাসা থেকে বের হলেও মাঝপথে এসে চালকরা অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন। অনেক সময় সেই টাকা দিতে না পারলে যাত্রীদের মাঝপথে নামিয়ে দেওয়া হয়, যা নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে কর্মস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয় এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনেও বিঘ্ন ঘটে।
তবে পরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খলার পেছনে চালকদের পক্ষ থেকেও কিছু কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এক সিএনজি চালক বলেন, “গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই আমরা বাধ্য হয়ে ভাড়া বেশি নিচ্ছি। আগের দামে গাড়ি চালানো এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।”
প্রতিবেদক যখন তাকে প্রশ্ন করেন, সরকার তো সংসদে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত থাকার কথা জানিয়েছে-তাহলে অতিরিক্ত ভাড়া কেন নেওয়া হচ্ছে? জবাবে ওই চালক বলেন, “গ্যাস পাম্প কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস নেয়, তাহলে আমাদের করার কী আছে? আমরা তো বাধ্য হয়েই ভাড়া বাড়াচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “যদি সত্যিই দেশে গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুত থাকে, তাহলে গ্যাস পাম্পগুলো কেন বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করছে-সেটা প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত। তারা যদি ইচ্ছেমতো দাম নেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন যানজট নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ফলে চালকদের একটি অংশ সুযোগ নিয়ে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট ভাড়া তালিকা প্রণয়ন ও দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ, নিয়মিত তদারকি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা চালু করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন তারা।
সব মিলিয়ে উখিয়ার পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় যাত্রী হয়রানি একটি স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে-এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।


পাঠকের মতামত