নোংরা পরিবেশ, চিকিৎসক সংকট ও দায়িত্বে অবহেলায় স্বাস্থ্যসেবা হুমকিতে
উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চরম অব্যবস্থাপনা


কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা-এর একমাত্র সরকারি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন চরম অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বে অবহেলা ও নোংরা পরিবেশের কারণে রোগীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। হাসপাতালজুড়ে অপরিচ্ছন্নতা, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, রোগীদের প্রতি অবহেলা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এতে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে উপজেলার হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী।
সম্প্রতি সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো হাসপাতাল এলাকায় অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। রোগীদের জন্য রান্না করা খাবারের স্থানও ছিল অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর। ভর্তি ওয়ার্ডগুলোতে রোগীরা মানবেতর অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। চারদিকে ময়লা-আবর্জনা, অপরিচ্ছন্ন বাথরুম এবং দুর্গন্ধে দমবন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসক সরকারি অফিস চলাকালে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও মিটিংয়ের অজুহাতে হাসপাতালের বাইরে সময় কাটান। অথচ নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন তারা। এতে রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, সরকার হাসপাতালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখতে সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) প্রকল্প স্থাপন করলেও বর্তমানে সেটি অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। হাসপাতালের ছাদে সোলার প্যানেলের কাঠামো থাকলেও ব্যাটারিসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো হাসপাতাল অন্ধকারে ডুবে যায়।
হাসপাতালের হাম টিকাদান কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বোরহান উদ্দিনের নাম তালিকায় থাকলেও তাকে হাসপাতালে দেখা যায়নি। সেখানে মাত্র একজন ভ্যাকসিনেটর দিয়ে কোনো রকমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, যেখানে দুইজন কর্মী থাকার কথা, সেখানে একজন দিয়ে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত চক্ষু বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, দায়িত্বে থাকা এক নার্স দরজা বন্ধ করে ঘুমাচ্ছেন। দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকির পর তিনি ঘুম থেকে উঠে বাইরে আসেন। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা।
রোগী ভর্তি বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে। চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলায় রোগীরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেক রোগী অভিযোগ করেন, সময়মতো চিকিৎসক পাওয়া যায় না এবং নার্সদের আচরণও সন্তোষজনক নয়।
রোগীর অভিভাবক নুর আহমেদ অভিযোগ, ডা. এহেছান উল্লাহ সিকদার অফিস সময়ে হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকেন। তাকে অফিসে কিংবা মোবাইল ফোনে সহজে পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তিনি সরকারি এই হাসপাতালে রোগী না দেখলেও কিন্তু নিয়মিত প্রাইভেট চেম্বার পরিচালনা করছেন।
একই অভিযোগ উঠেছে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো সাজেদুল ইমরান শাওন-এর বিরুদ্ধেও। সম্প্রতি হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা কক্সবাজার সিভিল সার্জন পরিদর্শন করলেও অদৃশ্য কারণে চোখে পড়েনি৷
এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহেছান উল্লাহ সিকদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, “হাসপাতালে জেনারেটর সুবিধা রয়েছে। তবে কী কারণে সেটি চালু রাখা হচ্ছে না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) ব্যবস্থার কী অবস্থা, সেটিও আমার জানা নেই। যদি যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আপনাদের সহযোগিতাও কামনা করছি।
তিনি আরও বলেন, রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার। আপনারা যেসব অভিযোগ ও সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন, সেগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সিভিল সার্জন আরও বলেন, হাসপাতালের প্রধান কর্মকর্তা ও আবাসিক মেডিকেল অফিসারের প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি রোগী দেখারও দায়িত্ব রয়েছে। কাজের চাপের কারণে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। তবে হাসপাতালের কোথাও কোনো সংকট বা অনিয়ম থাকলে তা সমাধানের দায়িত্বও তাদের। বিষয়গুলো নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”


পাঠকের মতামত