প্রকাশিত: ১৪/০৬/২০১৬ ১০:০১ পিএম

পলাশ বড়ুয়া::
দেশে শিশু শ্রম সমস্য সমাধানে নেই কোন কার্যকরী ব্যবস্থা। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (১৯৮৯)  এ স্বাক্ষরকারী ও অনুসমর্থনকারী প্রথম রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে  অন্যতম একটি হলো বাংলাদেশ।
১৯৯৪ সালে  জাতীয় শিশু নীতি প্রণয়ন করা হয় বটে কিন্তু আদৌ সুনির্দিষ্ট ভাবে আমাদের দেশে কোন  কার্যকরী পদক্ষেপ নেই। শুধু ঢাকা বা সিলেট শহর নয় সারাদেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা। শ্রম আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিব্যি বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশু শ্রম।

মো: ইসমাইল বয়স-১১ উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ক্লাশপাড়া গ্রামের মৃত আইয়ুব আলী পুত্র। শারীরিক ভাবে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। ১২ জুন (রবিবার) ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে রিক্সা নিয়ে। কেননা, ঘরে থাকা ৩ ভাই-বোন ও বিধবা মায়ের অন্ন যে যোগাড় করতে হবে। আমাকে দেখে মৃদুস্বরে বলল আপনি কি কোর্টবাজার যাবেন ? বললাম হ্যাঁ। কিন্তু তুমি তো অনেক ছোট রিক্সা টানতে পারবে তো ? তার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে রিক্সায় উঠি এবং যেতে যেতে তার পারিবারিক অবস্থা ও ঝুকিপূর্ণ কাজে তার আতœনিয়োগের বিষয়টি আমাকে পীড়া দিচ্ছে দারুণ ভাবে। তার চাহিদার চেয়ে কিছু বাড়িয়ে দিয়ে বললাম রিক্সাটা কি ভাড়ায় চালিত নাকি নিজেদের ? ভুমিহীন পিতার চালিত রিক্সাটি ছাড়া সহায় সম্বল বলতে কিছুই নেই বলে জানায় ইসমাইল। পিতার মৃত্যু পরবর্তী রিক্সা ভাড়ার টাকায় কোন রকম খেয়ে না জীবন কাটালেও বিগত ৫ মাস আগে থেকে নিজেই রিক্সা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছে বলে জানায়। দৈনিক কত টাকা আয় করে জানতে চাইলে বলে শরীর সুস্থ থাকলে ২/৩শ টাকা ইনকাম হয়। এই টাকায় সবাইকে নিয়ে কোনরকম দিন চলে যায়। পিতৃ বিয়োগের কারণে ভর্তি হয়েও প্রাথমিকে পড়া সম্ভব হয়নি বলে জানায় ইসমাইল।

দেশে বিভিন্ন আইন, নানা উদ্যোগ আর আয়োজনের পরও যেন বেড়েই চলছে শিশু শ্রম। লাখ লাখ শিশু শ্রম দিচ্ছে কল কারখানা, গ্যারেজে, রিকশায়, ওয়ার্কশপে। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা আর দারিদ্রের জন্যই বেড়েই চলছে শিশু শ্রম। জীবিকার তাগিদে  জীবনের শুরুতেই কোমলমতি শিশুরা  মুখোমুখি হচ্ছে কঠিন বাস্তবতার। যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই-কলম। সেই বয়সেই হাতে তুলে নেয় কঠোর শ্রমের হাতিয়ার। দিনে  পর দিনে বাড়ছে জনসংখ্যা  আর বাড়ছে হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা। পরিবারকে দু-মুঠো অন্ন  আর অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন করতে যোগ দিচ্ছে বিভিন্ন পেশায়। এদের মধ্যে অনেক শিশুই ঝুঁকির্পূণ পেশায় নিয়োজিত। শিশু শ্রম নিরসনে নেই কোন কার্যকর উদ্যোগ। আমাদের দেশে স্কুল পড়ুয়া শিশুদের বৃহৎ একটি অংশ বিদ্যালয়ে যায় না। প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে স্কুলে গমন করতে পারে না। অনেকেই বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও চালিয়ে যেতে পারেনা পড়ালেখা। অর্থাভাবে থেমে যায় পড়াশোনা। পরিবারে অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে গিয়ে বিসর্জন দিতে হয় শিক্ষাজীবনের। পরিবারকে সাহায্য করার জন্য অল্প বয়সেই ঝুকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত হতে হয় অধিকাংশ শিশুকে।

শিশু শ্রম বন্ধের জন্য মূলত প্রয়োজন দারিদ্র মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের জন্য পরিবারের ছোট ছোট শিশুরা জড়িয়ে যায় বিভিন্ন কাজে। চায়ের দোকানে, গাড়ীর হেলপার,মুদির দোকানদার,সব্জি বিক্রি, ওয়ার্কশপে কাজ, বিল্ডি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করে থাকে। এসব শিশু শ্রমিক অনেকাংশে বেশি সময় কাজ করে থাকে কিন্তু তারা ন্যায্য মূল্য পায়না। কাজের চাপ থাকে প্রচুর। গৃহকত্রীর মেয়ে ঠিকই  স্কুলে যাওয়া আসা করে কিন্তু কখনো চিন্তা করেনি কাজের মেয়েটির কথা। কাজের চাপ সহ্য করতে না নীরবে কান্না কাটি করতে থাকে এসব শিশুরা। কর্ত্রীর চোখ রাঙানিতে কাজের মেয়েরা অনেক সময় প্রতিবাদ করতে চাইলে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা অত্যাচার করতে থাকে। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও হাত তোলে এসব অসহায় শিশু শ্রমজীবিদের শরীরে। অনেক সময় জানা  যায় গৃহকৃত্রীর অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে  আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়। অনেক কিশোরী  মানুষের বাড়িতে কাজ করা অবস্থায় বাড়ির কর্তা কর্তৃক যৌন হয়রাণির শিকার হয়ে থাকে। প্রতিবাদ করার সুযোগ পায়না ভিকটিম কিশোরী।

জাতীয় শিশু নীতির আলোকে যে সকল প্রতিষ্ঠানে শিশুরা নিয়োজিত আছে, সেখানে শিশুরা যেন কোনরূপ শারিরিক, মানসিক, ও যৌন  নির্যাতনের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে। বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন। পাড়া মহল্লায় বিভিন্ন বাড়ীতে যারা কিশোরীদেরকে নিজেদের তত্তাবধানে রেখে কাজ করান আসলে কতটুকু মেনে চলেন জাতীয় শিশু নীতি।

শিশু শ্রম নিবারণ করতে হলে প্রয়োজন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমণি¦ত উদ্যোগ আর সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

লেখক : প্রকাশক ও সম্পাদক, সিএসবি২৪ ডটকম, ইমেইল : রহভড়পংন২৪@মসধরষ.পড়স

পাঠকের মতামত

 

গণভোটে “হ্যাঁ” জয়যুক্ত হলে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে:মেয়াদ হবে চার বছর

​২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সময়। একটি বৈষম্যহীন এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক ...

“বিগত প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, বাস্তবায়নই হোক উখিয়া-টেকনাফের আগামী”

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত  উপজেলা—উখিয়া ও টেকনাফ। এই জনপদ আজ মাদক, ...

ভুল হোক ফুল

আমাদের এই ছোট্ট জীবনটার পুরোটাই হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্র।যত সময় যাচ্ছে, ততই যেন আমরা নতুন বিষয় ...