প্রকাশিত: ২৬/১১/২০২০ ৯:২১ এএম

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কাজ করছে ভারত। কারণ, এটা স্পষ্ট যে এই সংকট আরও গভীর হলে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, ভারতসহ পুরো উপমহাদেশের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে। গতকাল বুধবার বিকেলে সমকাল কার্যালয় পরিদর্শনে এসে এ কথা বলেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী।
তিনি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, উপমহাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ইস্যু, অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন, সীমান্ত বন্ধ, সংবাদপত্রের চ্যালেঞ্জসহ চলমান বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। সমকাল কার্যালয় পরিদর্শনের আগে হা-মীম গ্রুপের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমকাল প্রকাশক, হা-মীম গ্রুপ ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। এ সময় বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন তারা। সমকালের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিময়ে অংশ নেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, উপসম্পাদক আবু সাঈদ খান, সহযোগী সম্পাদক সবুজ ইউনুস, বার্তা সম্পাদক মশিউর রহমান টিপু, নগর সম্পাদক শাহেদ চৌধুরী, ফিচার সম্পাদক মাহবুব আজীজ, প্রধান প্রতিবেদক লোটন একরাম, বার্তা সম্পাদক (অনলাইন) গৌতম মন্ডল, সহকারী সম্পাদক শেখ রোকন ও সিরাজুল ইসলাম আবেদ, বিশেষ প্রতিনিধি জাকির হোসেন, রাশেদ মেহেদী, সাহাদাত হোসেন পরশ, ক্রীড়া বিভাগের প্রধান সঞ্জয় সাহা পিয়াল, জিএম (মার্কেটিং) ফরিদুল ইসলাম এবং জিএম (সার্কুলেশন) হারুনুর রশীদ।
মতবিনিময়কালে হাইকমিশনার বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য ভারত বিশ্ব ফোরামে চিৎকার করছে না ঠিকই। কিন্তু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কাজ করছে। ভারত আন্তরিকভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান চায়। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটা বড় বোঝা। আন্তর্জাতিকভাবে মানবিক সহায়তা এলেও সিংহভাগ খরচ এবং পরিবেশ ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় যে ক্ষতি, তা বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে। এ অবস্থাটা কখনোই কাম্য নয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, সে জন্য ভারত বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানায়।

তিস্তাসহ দুই দেশের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ইস্যু নিয়ে তিনি বলেন, বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ইস্যুর সমাধান অবশ্যই হবে। এটি অভ্যন্তরীণভাবেও ভারতের একটি বড় ইস্যু। ভারতের একাধিক রাজ্যের মধ্যেও অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা নিয়ে জটিলতা আছে। ফলে অত্যন্ত সংবেদনশীল এ ইস্যুটির সমাধান হয়তো চট করেই হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সুসম্পন্ন করতে ভারত অত্যন্ত আন্তরিক।
হাইকমিশনার জানান, দুই দেশের টেকনিক্যাল টিম বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। কিন্তু ভারতের ফেডারেল রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ভেতরে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেই এ ধরনের একটি চুক্তি করতে পারে না। এ জন্য সংশ্নিষ্ট রাজ্য সরকারেরও সমর্থন লাগে। সব মিলিয়ে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন চুক্তি করতে কিছুটা সময় লেগে যাচ্ছে। তবে পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান হবেই।
সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ভারত সব সময়ই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং এ দুই দেশের গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এ অবস্থায় ভারত কখনোই একটি বন্ধু দেশের সীমান্তে কোনো ধরনের রক্তপাত কোনো অবস্থাতেই চায় না। কিন্তু কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটছে, এটা সত্য। দেখা যায়, এ ঘটনাগুলো ঘটে রাত ১১টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে। কারণ, এ সময়টাতে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানের মতো অপরাধ ঘটে।
তার দাবি, বেশিরভাগ সময়ই চোরাকারবারিরা সংঘবদ্ধ হয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ওপর হামলা চালায়। বিএসএফের অনেক সদস্যই চোরাকারবারিদের হাতে হতাহত হচ্ছেন। তবে মিডিয়ায় বিএসএফ জওয়ানদের হতাহত হওয়ার খবরটি অতটা আসে না। ফলে মানুষ প্রকৃত সত্যটিও অনেক সময় জানতে পারছে না। কিন্তু যা-ই ঘটুক, সীমান্তে হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় বাহিনী ‘নন-লিথাল’ (প্রাণঘাতী নয় এমন) অস্ত্র ব্যবহার করে। আশা করা যায়, দু’দেশের যৌথ প্রচেষ্টায় সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পণ্য ভারতে প্রবেশের ব্যাপারে ভারত খুবই উদারনীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে কর রেয়াত সুবিধাসহ অনেক ধরনের সুবিধা দিচ্ছে। অশুল্ক্ক বাধাও যেন না থাকে, ভারত সে জন্য সচেষ্ট। তবে বাংলাদেশে অন্য কোনো দেশের উৎপাদিত পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে যৌক্তিকভাবে এ সুবিধা পাওয়ার কথা নয়। ভারত সেটা পর্যবেক্ষণেও রাখে। এ ছাড়া বাংলাদেশে বিনিয়োগও বাড়িয়েছে ভারত। লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এক যুগ আগে ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইতে পাকিস্তানি জঙ্গিদের নৃশংস হামলার ঘটনার উল্লেখ করে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ওই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ছিল ভারতের মাটিতে পাকিস্তানের স্পষ্টত রাষ্ট্রীয় মদদে হামলার ঘটনা। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ১৭০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। এ হামলার ঘটনার পর এক যুগ পার হয়েছে, ভারত অকাট্য তথ্য-প্রমাণ দেওয়ার পরও পাকিস্তান হামলার মাস্টার-মাইন্ডদের বিচার প্রক্রিয়াই শুরু করেনি। এটা প্রমাণ করে, পাকিস্তান এ হামলার বিচার চায় না। কারণ, তারাই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এ হামলা চালিয়েছিল।
তিনি বলেন, এ হামলার মাস্টার-মাইন্ডদের বিচার না হওয়ার কারণে উপমহাদেশজুড়ে নিরাপত্তার বিষয়টি হুমকির মুখে থেকে গেছে। তিনি আরও বলেন, ভারত কখনোই প্রতিশোধের নীতি গ্রহণ করে না। ভারত ন্যায়বিচার ও শান্তির পক্ষে। কিন্তু পাকিস্তান শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে তাদের অবস্থান প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে।
সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক বেশি বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণেই প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব বাড়ছে। কারণ, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তথ্যের জন্য এখনও আস্থার জায়গা প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমই। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ-ভারত ঐতিহাসিক ও নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের গণমাধ্যমেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে।

পাঠকের মতামত

রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে জড়িত: সেনাপ্রধান

রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপকর্মে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ...

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বারোটা বাজিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে শুধু দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কারণেই আগের সরকার প্রত্যাবাসন উদ্যোগকে ব্যর্থ করে ...

সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াটাও কঠিন হয়ে যাবে একদিন: বিদ্যুৎমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বাংলাদেশ এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ...
Single Page Footer