প্রকাশিত: ৩১/০৮/২০১৭ ৯:৫০ পিএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ২:১৮ পিএম

শামীম ইকবাল চৌধুরী, নাইক্ষ্যংছড়ি::
চেহারা ও গঠন প্রকৃতি বাঙালিদের মতো হওয়ায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাঙালি আখ্যায়িত করে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। নির্যাতন, অত্যাচার সহ বিশ্বাসগত কারণে একই ভ্রাতৃতে বলেই মিয়ানমার সামরিক জান্তা গোটা আরাকানের মুসলমানদের মুরগীর বাচ্চার ন্যায় খাঁঁচার মধ্যে আবদ্ধ করেছে। তাদের নেই নাগরিক মৌলিক অধিকার খর্ব করে মুসলিম-রাখাইন জাতিগত দাঙ্গা শুরু করে এবং নির্বিচারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যার কারণে গোটা আরাকান রাজ্যে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অর্তনাদে এখন আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বৌদ্ধ ধর্মে জীব হত্যা মহাপাপ হলেও তারা বৌদ্ধ ধর্মের এ মহান বাণী কাজের মাধ্যমে অস্বীকার করছে। আরাকান থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম-রাখাইন নিধনই তাদের মূল লক্ষ্য। গত বৃহস্পতিবার (২৪ আগষ্ট) থেকে শুরু হওয়া সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে মিয়ানমারের পাশাপাশি বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষীদের মাঝেও অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। সীমান্তের দুই দেশের অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ফলে সীমান্তে এখন নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ঘুমধূম সীমান্তে ৩১শে আগষ্ট বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে ঘুমধুমের জলপাইতলী এলাকায় অবস্থান করেছে। অনুপ্রবেশকারীরা কোনরকম খোলা আকাশে রাত যাপন করছে। আবার কিছু কিছু রোহিঙ্গা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে অনুপ্রবেশ করে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়।

বুধবার ৩০ শে আগস্ট সীমান্তের চাকঢালায় দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়-বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের চাকঢালা সীমান্তে (বাংলাদেশ-মিয়ানমার) জিরো পয়েন্টের পাঁচটি পাহাড়ে অন্তত ২৩ হাজার রোহিঙ্গা গরু ছাগল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তাঁরা সীমান্তের বড়ছনখোলা ভিতরের ছড়া, ছেড়াখালের আগা, আতিকের রাবার বাগান, সাপমারাঝিরি ও নুরুলআলম কোম্পানির রাবার বাগানেও এইসব রোহিঙ্গারা ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে গত শুক্রবার থেকে অনিশ্চিত জীবন পার করছেন। মিয়ানমারের কাঁটাতার ভেদ করে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তালিকাও ঘন্টার পর ঘন্টা দীর্ঘ হচ্ছে। তবে তাঁরা যেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতেনা পারে সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছেন বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবির সদস্যরা আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নজরদারিতে রেখেছেন। বাংলাদেশের স্থানীয়রা মানবতা দেখিয়ে তাদেরকে শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করছেন। এরপরও অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের চলছে খাবারের জন্য হাহাকার। খেয়ে না খেয়েই দিন কাটাচ্ছে বসবাসরত হাজারহাজার রোহিঙ্গা। এতে একজনের খাবার খাচ্ছেন পাঁচজনে। যেখানে অবস্থান করেছে সেখানের প্রতিটি ঝুপড়িতে কানায় কানায় ভর্তি হয়ে যাওয়ায় তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই আর। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে সর্বশান্ত এ রোহিঙ্গারা এখন দিশেহারা।

আর এদিকে সীমান্তের বিজিবির পাহারায় আবদ্ধ রোহিঙ্গা মুসলমানরা পাহাড়-পার্বত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ফলে নতুন করেক কক্সবাজার সীমান্ত অঞ্চল ও নাইক্ষ্যংছড়িসহ পুরো দুই জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল রোহিঙ্গাদের ভারে নুয়ে পড়বে।

গতকাল ৩০ আগষ্ট বুধবার বিকেলে বান্দরবান জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার বণিক সীমান্ত পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এর সাথে ছিলেন ৩১-বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল আনোয়ার আযিম, বান্দরবানের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার, উপ-অধিনায়ক মেজর আশরাফ আলী, ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ কামালউদ্দীন , নির্বাহী কর্মমকর্তা এসএম সরওয়ার কামাল, সদর ইউপি চেয়ারম্যান তসলিম ইকবাল চৌধুরী, জেলা পরিষদ সদস্য মাষ্টার ক্যউচিংচাক, নাইক্ষ্যংছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি শামীম ইকবাল চৌধুরী, সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল হামিদ, সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার নয়ন, আওয়ামীলীগ সদস্য সচিব মোঃ ইমরান প্রমূখ।

জাতিসংঘের মতে, বিশ্বের অন্যতম নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মুসলিম রোহিঙ্গা। দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়ছেন তারা। দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে তাদের। হন্যে হয়ে এদিক-সেদিক ঘুরছেন একটু আশ্রয়ের আশায়।

নাইক্ষ্যংছড়িস্থ ৩১ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল আনোয়ার আযিম এ ব্যাপারে বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে আমাদের দেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তারা জিরোপয়েন্টে অবস্থান করছে। পাশাপাশি সীমান্তে সব ধরনে পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান তসলিম ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে। সরকারের নির্দেশনা রয়েছে-তাঁরা যেন আমাদের দেশে অনুপ্রবেশ না করে। এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি।

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারীতে মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করার পর বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং এ নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীর কয়েকজন সরকারি পদস্থ দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুথ্যান ঘটিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্নখাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার শুরু হয়। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয় এবং হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি জোরকরে কেড়ে নেওয়া হয় এবং বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। শিক্ষা-স্বাস্থ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিয়ে করার অনুমতি নেই, সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয়না এবং রোহিঙ্গাদের সংখ্যা যাতে না বাড়ে সেজন্য আরোপিত হতে থাকে একের পর এক বিধি নিষেধ।

সর্বশেষ ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে।

পাঠকের মতামত

টেকনাফে জনতার বিক্ষোভের মুখে গণশুনানি পন্ড; কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতা অবরুদ্ধ!

“ইউনিয়ন বিভক্তি হলে আমরণ অনশন করবো” “বর্গকিলোমিটারের অজুহাতে ইউনিয়ন বিভক্তি চাই না” “ইউনিয়ন বিভক্তি হলে ...

কক্সবাজারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা গাইডলাইন অনুমোদন

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা (এলএসবিই) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গাইডলাইন উপস্থাপন ও অনুমোদনবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত ...

ইয়াবা কারবার, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আতঙ্কে উখিয়া-টেকনাফ

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সংঘবদ্ধ অপরাধ, সশস্ত্র তৎপরতা ও অপহরণ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের ...

টেকনাফের ‘জাফর চেয়ারম্যান’ দুনীর্তির দায়ে ৭ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদকে সম্পদের তথ্য গোপন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ...

অপহরণ-সন্ত্রাসে জনশূন্য জুম্মাপাড়া, আতঙ্কে ঘরছাড়া ২০০ পরিবার

রহমত উল্লাহ • কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের জুম্মাপাড়া এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে অপহরণ আতঙ্ক বিরাজ ...
Single Page Footer