ভাঙা ঘর, ভাঙা স্বপ্ন, তবু বেঁচে থাকার লড়াই

মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারানোর পথে নুরুল আলম

এম.এ রাহাত, উখিয়া
প্রকাশিত: ০৭/০৯/২০২৬ ৪:২৪ পিএম

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মিয়াজি পাড়ার বাসিন্দা দলিল আহমদের পুত্র নুরুল আলম (৫০)। । জীবনের শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন তিনি। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর মা ও ভাই-বোনের সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয় তাকে।

মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে চলেছে সংসার। একসময় কাজের অভাবে ট্রাকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ট্রাকচালক।

কাজের আয় কিছুটা ভালো হলে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নুরুল আলম। মাটির দেয়াল ও টিন দিয়ে তৈরি করেন নিজের একটি ছোট্ট ঘর। বিয়ে করে ঘরে তোলেন স্ত্রীকে। নিজের একমাত্র বোনের বিয়েও দেন। এরপর সংসারে একে একে জন্ম নেয় আট ছেলে সন্তান। কিন্তু সুখের সংসার বেশিদিন টেকেনি।

করোনাকালে এক ছেলের মৃত্যু হয়। এরপর স্ত্রী সাত সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামে চলে যান। স্ত্রী-সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন নুরুল আলম। মা ও ছেলে তখন ওই বাড়িতে একসঙ্গে বসবাস করতেন। বৃদ্ধ মায়ের দেখাশোনার জন্য পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন তিনি।

একসময় সেই মাকেও হারান নুরুল আলম। মা-বাবা নেই, স্ত্রী-সন্তানও পাশে নেই, জীবনের শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায় সেই মাটির ঘরটিই।

কিন্তু ভাগ্য যেন তার পিছু ছাড়েনি। শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে গাড়ি চালাতে পারছেন না তিনি। ফলে বন্ধ হয়ে যায় তার দীর্ঘদিনের উপার্জনের পথ। বর্তমানে স্থানীয় একটি মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ও মসজিদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কাজ পেলে করেন, না পেলে কোনো রকম ডাল-ভাত খেয়েই দিন পার করেন।

নুরুল আলমের দাবি, বিগত সরকারের সময়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে দুটি রাজনৈতিক মামলা হয়। মামলার কারণে দীর্ঘদিন তাকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। পরে ৫ আগস্টের পর মামলা দুটিতে জামিন পান এবং পরবর্তীতে মামলা থেকে খালাসও পান বলে জানান তিনি। এরপর স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও উপার্জনের স্থায়ী কোনো পথ আর তৈরি হয়নি।

বর্তমানে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

এরই মধ্যে সম্প্রতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে পড়ে নুরুল আলমের সেই শেষ আশ্রয়টুকুও। মাটির দেয়াল ধসে ঘরের চাল মাটিতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে তার ঘর।

অভাবের সংসারে নতুন করে ঘর তৈরি করা এখন তার কাছে প্রায় অসম্ভব। কোথা থেকে টাকা আসবে, কীভাবে আবার মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে, এই চিন্তায় দিশেহারা নুরুল আলম।

উপায় না পেয়ে বিষয়টি স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ হোসাইন সিকদারকে জানান তিনি।

নুরুল আলম বলেন, ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করে জীবন পার করছি। বাবা-মা কেউ নেই। স্ত্রী-সন্তানও পাশে নেই। গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতাম, এখন শরীর চলে না। মসজিদের খাদেমের দায়িত্ব পালন করে কোনো রকমে দিন কাটে। এর মধ্যে বৃষ্টিতে ঘরটিও ভেঙে গেছে। এখন কীভাবে ঘর বানাব, সেটাই বুঝতে পারছি না।

তার চোখে-মুখে এখন একটাই প্রশ্ন, আবার কি দাঁড়াতে পারবেন নিজের পায়ে? নাকি ভাঙা ঘরের সঙ্গে ভেঙে যাবে তার শেষ আশাটুকুও?

স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ হোসাইন সিকদার বলেন, নুরুল আলমের বিষয়টি আমি জেনেছি। তার ঘরটি বৃষ্টিতে ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি খুবই অসহায় অবস্থায় আছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।

জালিয়াপালংয়ের মিয়াজি পাড়ার নুরুল আলমের জীবন যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। শৈশবে বাবাকে হারানো থেকে শুরু করে মা হারানো, স্ত্রী-সন্তান থেকে বিচ্ছিন্নতা, মামলায় পালিয়ে বেড়ানো, কর্মক্ষমতা হারানো, সবশেষে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারানোর উপক্রম। তার এখন বড় কোনো চাওয়া নেই। শুধু চান একটি নিরাপদ ঘর, যেখানে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে শান্তিতে দিন কাটাতে পারবেন।

পাঠকের মতামত

Single Page Footer