
১৩শ শতাব্দীতে মোঙ্গলদের বিধ্বংসী আক্রমণ ইসলামী বিশ্বকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের পতনের পর ১২৫৮ সালে বাগদাদও ধ্বংস হয়, যার ফলে আব্বাসীয় খিলাফতের অবসান ঘটে। শাম ও ফিলিস্তিনের অধিকাংশ শহরও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। মনে হচ্ছিলো, ইসলামী সভ্যতার সম্পূর্ণ অবসান অনিবার্য। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত মোড়ে এই বিপর্যয় উল্টে যায়। চেঙ্গিস খানের (১১৬৫-১২৭৭) নাতি এবং হালাকু খানের চাচাতো ভাই বারকা খান মিসরের মামলুক সুলতানদের সঙ্গে জোট বাঁঁধেন। এই জোট মোঙ্গল আক্রমণের ঝড়কে রোধ করে দেয়, যেই ঝড় উত্তর আফ্রিকা, আরব উপদ্বীপ এমনকি ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত।
প্রথম মুসলিম মোঙ্গল শাসক
১২২৭ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন বারকা খান। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যুদ্ধের প্রস্তুতি, রক্তপাতের কাহিনি এবং বিজয়ের উল্লাসের মধ্য দিয়ে। বারকা খান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন প্রথম মোঙ্গল শাসক হিসেবে, যিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, অন্তরের টান থেকেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তাঁর রাজকীয় তাঁবু মসজিদে রূপ নেয়, আর তাঁর সৈন্যবাহিনী হয়ে ওঠে মুসলমানদের রক্ষাকবচ।
তাঁর এই ধর্মান্তর শুধু ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং রাজনীতির ময়দানেও প্রভাব ফেলেছিল। এই ধর্মান্তর তাঁকে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের অন্যান্য শাখা থেকে আদর্শগতভাবে পৃথক করে তোলে। তিনি মিসরের মামলুকদের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক জোট গড়ে তোলেন তাঁরই চাচাতো ভাই হালাকু খানের বিরুদ্ধে—যে ১২৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংস করে ইসলামী সভ্যতার হূদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিলো। হালাকু খানের সঙ্গে তাঁর বৈরিতা ক্রমেই বাড়তে থাকে, এবং একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
তেরেকের তীরে ইতিহাসের বাঁক
বারকা খান ও হালাকুর মধ্যকার এই সংঘর্ষ (১২৬২-১২৬৩) ইতিহাসে মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রথম আন্তঃশাখীয় গৃহযুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত। সেই বছরের শীতকালে উত্তর ককেশাসের তুষারাবৃত পাহাড়-পর্বতের মাঝে তেরেক নদীর তীরে বারকা খান ও হালাকু খানের বাহিনীর মাঝে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
হালাকু দারবন্দ পাস দিয়ে উত্তরে অগ্রসর হন। তেরেক নদীর তীরে পৌঁছাতেই অতর্কিত আক্রমণ শুরু হয়। বারকার ভাগ্নে ও দক্ষ সেনাপতি নোগাই খাঁন গোল্ডেন হোর্ডের বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
হালাকুর সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। পলায়নরত সৈন্যরা বরফ-ঢাকা নদী পার হতে গিয়ে বিপদে পড়ে যায়। ভারী সৈন্য ও ঘোড়ার চাপে বরফ ভেঙে পড়ে হাজার হাজার মোঙ্গল যোদ্ধা ঠাণ্ডা জলে ডুবে মারা যায়।
ইসলামের বিস্তার ও কিপচাক খানাত
বারকা খানের প্রভাবে কিপচাক অঞ্চলে (বর্তমান কাজাখস্তান, ইউক্রেন, ককেশাস ও ভলগা অববাহিকায়) ইসলামের বিস্তার ঘটে। বহু মোঙ্গল ও তাতার গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। যদিও তাঁর পূর্বসূরিদের আমল থেকেই মুসলিম বণিক ও সুফিদের কার্যক্রম ছিল, তবে বারকা খানের পৃষ্ঠপোষকতা ইসলামকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী শাসকদের সময়ে গোল্ডেন হোর্ডে ইসলাম আরও সুদৃঢ় ভিত্তি লাভ করে।
এর ফলে তাতার ও কিপচাক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের বিস্তার ঘটে, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
এছাড়াও ঐতিহাসিক আইনে জালুত যুদ্ধে বারকা খানের পাঠানো একদল মঙ্গোল মুসলিম সৈন্য মামলুকদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল এবং মঙ্গোলদের পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কায়রোতে আব্বাসীয় খেলাফত পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে বারকা খান খলিফার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।
মৃত্যু
১২৬৭ সালের জানুয়ারি মাসে হালাকু খানের ছেলে আবাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার পথে এই মহান বীর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর আরও ৫০ বছর ধরে এই অঞ্চলে ইসলামের প্রচার অব্যাহত থাকে, যার ফলে আজও এই অঞ্চলের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী ইসলামের ছায়াতলে আছে।
তথ্যসূত্র
আল-কামিল ফিত-তারিখ, ইবনুল আসির
জামিউত-তাওয়ারীখ—রশিদুদ্দিন ফজলুল্লাহ হামাদানি
আল-মোঙ্গল ফিত-তারিখ, আবদুল কারিম আল-খতিব
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক


পাঠকের মতামত