রোহিঙ্গা ঢলের পাঁচ বছর
‘কক্সবাজারের শিক্ষা ব্যবস্থার বারটা বাজিয়েছে’

রোহিঙ্গা ঢলের পাঁচ বছর পূর্তির প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে কক্সবাজারের উখিয়া ডিগ্রী কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আলমগীর মাহমুদ এক কথায় বললেন- রোহিঙ্গা ঢলের কারণেই তাঁর কলেজের শিক্ষার্থীরা তাঁকে চিনেন না। আবার তেমনি তিনিও চিনেন না কলেজের বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের। কলেজের নিত্যদিনের রুটিন মাফিক লেখাপড়া বাদ দিয়ে রোহিঙ্গা শিবিরের এনজিওতে চাকরি নিয়েই ছাত্র-ছাত্রীরা ছুটে চলেছেন।
অধ্যাপক আলমগীর মাহমুদ অতি দুঃখের সঙ্গে বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গা ঢল সামাল দিতে এগিয়ে আসে এনজিওগুলো।
বিজ্ঞাপন
সেইসব এনজিওগুলো মোটা অংকের বেতন দেওয়ায় কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজ শুরু করেন শিবিরে। দৈনিক ক্লাসের পাঠদানে উপস্থিত থাকে শতকরা ২০/৩০ জন শিক্ষার্থী মাত্র। পরীক্ষা দিতে আসলেও ফেলের চিত্র ভয়াবহ। তিনি দুঃখের সঙ্গে জানান- ‘শিক্ষার্থীরা দৈনিক ক্লাসে উপস্থিত না হওয়ায় আমরা সম্মানিতও হচ্ছি না। রাস্তায় অনেক ছাত্র-ছাত্রী গা ঘেঁসে পথ পাড়ি দিচ্ছে কিন্তু সালামও করে না। তার কারণ হচ্ছে তারা তো আমার মতো একজন শিক্ষককেই ভুলে গেছে। ’
অনুরূপ টেকনাফ কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আবদুল গফুর গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রসঙ্গে বলেন-‘এনজিওর চাকরি ছেড়ে ক্লাসে আসার জন্য অনেক আকুতি মিনতি করা হয় কিন্তু শিক্ষার্থীদের কানেও পৌঁছে না এসব কথা। একদিন ইনকোর্স পরীক্ষায় আমরা একই বিভাগের দুই শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা নিতে বসেছি। একজন ছাত্রকে বললাম, বলতো তোমার গফুর স্যার কে, সেই ছাত্র দেখিয়ে দিল আমার অপর সহকর্মী শফিক স্যারকে। অর্থাৎ ওই ছাত্র স্যারদেরও শনাক্ত করতে পারছে না। ’ তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ঢলের কারণে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফের শিক্ষা ব্যবস্থার বারটা বাজিয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা ঢলের প্রভাবে পুরো জেলায় প্রভাব পড়েছে।
বৃহস্পতিবার ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের ৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০১৭ সালের এদিনে প্রতিবেশী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে আসতে শুরু করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ৩৪টি শিবিরে এসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। যা বর্তমানে ১৩ লাখ ছাড়িয়েছে। তবে পাঁচ বছর গত হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৪-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)-এর অধিনায়ক সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, এখন ক্যাম্পের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গারা ১৫টি ক্যাম্পে সমাবেশ করার কথা রয়েছে। এ জন্য এপিবিএন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে। সমাবেশ করার অনুমতির বিষয়ে তিনি জানাতে পারেননি।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে রয়েছে। কারণ, রোহিঙ্গারা তুচ্ছ ঘটনায় খুনোখুনি ছাড়াও মাদকের ব্যবসা, অপহরণ, ছিনতাইসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। গত পাঁচ বছরে রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহসহ শতাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যদিও বিভিন্ন সংস্থার বেসরকারি তথ্যমতে পাঁচ বছরে ক্যাম্পে ১২০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত থানায় ১ হাজার ৯০৮টি মামলা হয়েছে। খুনের ঘটনা ঘটেছে ৯৯টি। যদিও বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে ১২০টি বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তিনি বলেন, খুনোখুনি, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগসহ ১৪ ধরনের অপরাধের জন্য এসব মামলা হয়েছে।
রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ নূর জানান- ‘প্রত্যাবাসনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক রোহিঙ্গা ভুলতে বসেছে তারা ভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে, সে বিশ্বাস উঠে গেছে। আমরা যারা নিজ দেশে চলে যেতে চাচ্ছি তারাও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে যেতে চাই না। এ কারণে প্রত্যাবাসন যেন গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে। ’
এদিকে উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘মানবিকতা দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এটি খুব সাময়িক। কিন্তু দীর্ঘ ৫টি বছর এভাবে বাংলাদেশের মাটিতে পড়ে থাকবে এটি কখনো মেনে নেওয়া যায় না। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন জরুরি। ’
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার অভিযোগ এনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর শুরু করে গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগ। তাদের বর্বর অত্যাচার নির্যাতনের মুখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে ১১ লাখ ১৮ হাজারেও বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। এ পরিস্থিতিতে গত ৫ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে আরো দেড় লাখেরও বেশি। সুত্র: কালের কন্ঠ

পাঠকের মতামত