

কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলাচলের জন্য শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) অনুমোদন রয়েছে মাত্র ৫৮টি সিএনজির। কিন্তু বাস্তবে ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে দুই শতাধিক লাল রঙের সিএনজি চলাচল করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত ক্যাম্পের বাইরে যাত্রী পরিবহন, অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত সিএনজি পরিচালনা এবং মাসোহারার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সিএনজি চালকরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আরআরআরসির অনুমোদিত তালিকায় প্রতিটি সিএনজির মালিক ও চালকের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, কোন কোন ক্যাম্পে চলাচলের অনুমতি রয়েছে এবং অনুমতির মেয়াদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। নিয়ম অনুযায়ী এসব লাল রঙের সিএনজি শুধুমাত্র নির্ধারিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে চলাচল করতে পারবে।
বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কিংবা জ্বালানি নেওয়ার উদ্দেশ্য ব্যতীত ক্যাম্পের বাইরে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ নেই।
কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, ক্যাম্পের জন্য অনুমোদিত একাধিক লাল রঙের সিএনজি সাধারণ যাত্রী পরিবহন করছে। স্থানীয়দের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন ধরেই এসব সিএনজি উখিয়া সদর, কুতুপালং, বালুখালী, মরিচ্যাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত চলাচল করছে।
একাধিক সিএনজি চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্যাম্পে সিএনজি চালাতে এবং অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত গাড়ি পরিচালনার সুযোগ পেতে নিয়মিত মাসোহারা দিতে হয়।
তাদের দাবি, প্রতিদিন গাড়িপ্রতি বিভিন্ন খাতে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। চালকদের অভিযোগ, ক্যাম্প ইনচার্জ এবং ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী এপিবিএনের কিছু অসাধু সদস্যের কাছে নিয়মিত অর্থ দিতে হয়। অর্থ না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানির মুখে পড়তে হয় বলেও দাবি করেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত ৫৮টি সিএনজির বাইরে আরও বিপুলসংখ্যক সিএনজি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় ক্যাম্পে চলাচল করছে। ফলে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাইরে একটি অদৃশ্য অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে।
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) উখিয়া উপজেলা সভাপতি নুর মোহাম্মদ সিকদার উখিয়া নিউজ ডটকমকে বলেন, “যদি অনুমোদনের বাইরে সিএনজি চলাচল করে কিংবা অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকে, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পের জন্য অনুমোদিত গাড়ি বাইরে বাণিজ্যিকভাবে চলাচল করা নিয়মবহির্ভূত। প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। স্থানীয়দের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এ বিষয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান উখিয়া নিউজ ডটকমকে বলেন, অনুমোদনের বাইরে কোনো সিএনজি চলাচল করলে কিংবা অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে জানাবেন। তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে এপিবিএনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুমোদিত সিএনজির তালিকা প্রকাশ, ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, ক্যাম্পের বাইরে অবৈধ চলাচল বন্ধ এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের ভাষ্য, অন্যথায় ক্যাম্পকেন্দ্রিক এই অদৃশ্য অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হবে এবং স্থানীয়দের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

পাঠকের মতামত