প্রকাশিত: ২৩/০৩/২০১৮ ৮:৪১ এএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ৫:০৬ এএম

উখিয়া নিউজ ডেস্ক::

মিয়ানমার থেকে আসা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। তারা কবে মিয়ানমারে ফিরে যাবে বা আদৌ ফিরতে পারবে কি না, সে নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, সুরক্ষাসহ সব দিক দেখতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আশ্রিত বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ পড়েছে সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার পাহাড়, ভূমি, বনসহ সবখানে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হলেও ইস্যুটি আন্তর্জাতিকীকরণের ফল এখনো মেলেনি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক সচেতনতা সত্ত্বেও চীনের মতো পরাশক্তির কথিত নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণে মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়নি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ফিলিস্তিনের মতো অন্তহীন সংকট সৃষ্টি হওয়া এড়ানোর চেষ্টা করেছিল ঢাকা। কিন্তু তা কোনোভাবেই ঠেকানো যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার শিকার হওয়া বাংলাদেশ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে গণহত্যা থেকে বাঁচাতে সীমান্ত খুলে দিয়েছিল। এ সুযোগে মিয়ানমার তার রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগকেই দেশছাড়া করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ, জাতিসংঘের সতর্কবার্তায় ইতিবাচক কোনো ফল আসেনি।

ইউরোপীয় রোহিঙ্গা কাউন্সিলের মুখপাত্র অ্যানিটা স্কুগ গতকাল বৃহস্পতিবার  বলেন, সব সংকটেরই সমাধান থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে বালিতে মুখ গুঁজে আছে। সংকট সমাধানের কোনো রাজনৈতিক ইচ্ছা তাদের নেই। তিনি বলেন, রাখাইনে যে রোহিঙ্গারা অবশিষ্ট আছে তাদের সুরক্ষার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। মিয়ানমারের গণহত্যা আর মেনে নেওয়া হবে না—এমন জোরালো বার্তা দেওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।

ফেরা অনিশ্চিত : জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে স্পষ্ট বলেছে, রোহিঙ্গা সংকটের সৃষ্টি ও সমাধান—দুটিই মিয়ানমারে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো পরিবেশ এখন মিয়ানমারে নেই। তাই কোনোভাবেই যেন রোহিঙ্গাদের জোর করে ফেরত না পাঠানো হয়। বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও তাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের ওপরই বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। জোর করে কাউকে ফেরত পাঠানোর কথা বাংলাদেশ বিবেচনা করছে না।

রোহিঙ্গা শিবিরে পরিস্থিতি দেখে আসা জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা বলেছেন, রোহিঙ্গারা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হয়ে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে। নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা ফিরে যেতে চায় না। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরার মতো পরিবেশ কবে সৃষ্টি হবে বা আদৌ কোনো দিন হবে কি না, তা কেউ জানে না।

ঢাকা ও নেপিডোর কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, গত নভেম্বর মাসের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের পরিচয় যাচাই সাপেক্ষে প্রত্যাবাসনে রাজি হলেও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়নি। প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ছিল এবং তাদের মিয়ানমারের কোনো না কোনো পরিচয়পত্র থাকতে হবে।

হাজার বছর ধরে রাখাইনে বসবাস করেও মিয়ানমার সরকারের বৈরী  নীতির কারণে বর্তমানে নাগরিকত্ব ও সব ধরনের সুবিধাবঞ্চিত রোহিঙ্গারা এসব শর্ত কতটা পূরণ করতে পারবে, তা নিয়ে শুরু থেকেই শঙ্কা ছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এ বিষয়টি ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকদের কাছেও তুলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের শর্ত মেনেই প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। চুক্তির পর পর প্রত্যাবাসন উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির নামে মিয়ানমার রোহিঙ্গা গ্রামগুলো বুলডোজার দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে বাড়ির ঠিকানা ধরে পরিচয় যাচাইকেও অসম্ভব করে তোলে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, গত নভেম্বর মাসের চুক্তিতে ২০১৬ সালের অক্টোবরের পর থেকে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিবেচনায় নেওয়ায় এর আগে আসা প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার ফেরত যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমার তার নিজের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেছিল, এমন কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি।

প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় বাংলাদেশের দেওয়া আট হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা থেকে মাত্র ৩৭৪ জনকে রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা বলে স্বীকার করেছে মিয়ানমার। ৯৫ শতাংশেরও বেশি রোহিঙ্গাকে অস্বীকার করে মিয়ানমার তার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ যে তথ্যসংবলিত তালিকা দিয়েছে তার মধ্যে সাত হাজার ৬৫৮ জনেরই তথ্য সঠিক নয়।

মিয়ানমারের কাছে পাঠানোর জন্য নতুন করে কোনো তালিকা তৈরি হচ্ছে কি না জানতে চাইলে সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম গতকাল বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, নতুন কোনো তালিকা এখন করা হচ্ছে না। মিয়ানমার একটি তালিকা ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তারাই এ ব্যাপারে জবাব দেবে।

চীনা সমীকরণ : চীন ও রাশিয়ার কারণে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বেশ কয়েকবার বৈঠক করে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ওপর প্রভাব রাখা সবচেয়ে বড় দেশ হলো চীন। বৈশ্বিক চাপ সত্ত্বেও মূলত চীনের কারণে মিয়ানমার নির্ভার আছে। এ ছাড়া কৌশলগত কারণে রাশিয়াও চীনের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে অভিন্ন অবস্থানে আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী আগামী মাসের শুরুতে রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন। সে সময় রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অন্যান্য ইস্যুর পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত চাং চুও গত বুধবার সাংবাদিকদের কাছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাঁর দেশের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, এখানে চীনের নিজস্ব কোনো স্বার্থ নেই। চীন এ ইস্যুতে নিরপেক্ষ আছে। চীন মনে করে, এ সংকট দ্রুত সমাধান হবে না। চীন আশা করে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বন্ধুত্বপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমেই এ সমস্যার সমাধান করবে।

মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, চীন যদি সত্যি সত্যি নিরপেক্ষ ও নিঃস্বার্থভাবে সঠিক, গঠনমূলক ও বাস্তবসম্মত সমর্থন দেয়, তাহলে এ সংকটের দ্রুত সমাধান হবে। আর যদি এটি কথার কথা হয়, তাহলে তিনি যেমন বলেছেন ‘দ্রুত সমাধান হবে না’ বা ‘দেরি হবে’—বাস্তবে সেটিই হবে। অনুপ কুমার আরো বলেন, ‘আমরা চাই এ সমস্যা সমাধানে চীনের সমর্থন।’

তবে রোহিঙ্গা সংকটের দিকে দৃষ্টি রাখছেন এমন কূটনীতিকরা বলছেন, চীন নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখার কথা বললেও তা মিয়ানমারের পক্ষে যাচ্ছে। কারণ রোহিঙ্গা সংকট ও নিপীড়ন নিয়ে সারা বিশ্ব উদ্বিগ্ন। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে জোরালো কোনো উদ্যোগ নিতে দিচ্ছে না চীন। এমনকি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বাইরে অন্য কোনো দেশ যুক্ত হোক, তা-ও পছন্দ করছে না।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান আগের চেয়ে বদলেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত অক্টোবর মাসে ঢাকা সফরকালে স্পষ্ট বলেছেন, রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার মধ্যেই এ সংকটের সমাধান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ মাসে নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধান বিষয়ে কথা বলেছেন। জানা গেছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন।

বিচারের উদ্যোগ নেই : রোহিঙ্গা হত্যা-নির্যাতনকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাখাইনে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডামা দিয়েং সম্প্রতি ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন, মিয়ানমারে যে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’ হয়েছে, তা স্পষ্ট। তিনি যেসব অভিযোগ পেয়েছেন, সেগুলো প্রমাণ করা গেলে তা গণহত্যা হিসেবে গণ্য হতে পারে। এসব সত্ত্বেও মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনার কোনো উদ্যোগ এখনো নেয়নি বিশ্বসম্প্রদায়।

বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ না থাকলেও ভবিষ্যতে কোনো এক সময় সেখানে বা আঞ্চলিক জোট আসিয়ানে বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশাবাদী অ্যাডামা দিয়েং। এ ক্ষেত্রে তিনি চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর নৈতিক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করেন।

অন্তহীন দায় বাংলাদেশের : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মানবিকতা ও মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এ সংকট দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় বাংলাদেশ বড় ধরনের চাপে পড়েছে। আগামী দিনে চাপ আরো বাড়তে পারে। দেশের নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ তাদের কক্সবাজারে বড় একটি এলাকায় রেখেছে। কিন্তু আগামী বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও রোগবালাইয়ে কয়েক হাজার রোহিঙ্গার জীবন ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে মানবিক সহায়তা দেওয়া বিভিন্ন সংস্থা। দেশি-বিদেশি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীরা সহায়তা দিলেও রোহিঙ্গাদের দেখভালের মূল দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকেই। এ থেকে কবে বাংলাদেশের মুক্তি মিলবে তা কারো জানা নেই।

পাঠকের মতামত

ডেসটিনির পরিচালনা বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার প্রশান্ত

হাইকোর্টের নির্দেশে ডেসটিনি-২০০০ এর পরিচালনা বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার প্রশান্ত ভূষণ ...

বান্দরবানে কেএনএফের আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযান, নিহত ৩

বান্দরবানের রুমা উপজেলার রনিন পাড়ার কাছে ডেবাছড়া এলাকায় কেএনএফের একটি আস্তানায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর ...