প্রকাশিত: ০৪/০২/২০১৭ ৭:২০ পিএম

বিডিটোয়েন্টিফোর লাইভ ডটকম::

২০১৬ সালটি এখন স্মৃতি। সঙ্গে স্মৃতি হয়ে গেছে কিছু হাসি মুখ। তবে, ওরা করুণ কথা লিখে গেল স্মৃতির পাতায়। ইস্যুর নিচে ইস্যু চাপা পড়তে পড়তে তনু, মিতু ও রিশাদের খবর এখন পুরনো। তাদের হত্যার বিচার দাবিতে এখন আর কেউ সরব নেই, কেউ রাস্তায় নামে না। বিচারের অগ্রগতিও নেই তেমন। এভাবেই হয়তো হারিয়ে যাবে ওরা। কিন্তু মুছবে না ওদের বাবা-মা ও স্বজনদের হৃদয়ের ক্ষত।

সোহাগী জাহান তনু:

সোহাগী জাহান তনুর বাবা কুমিল্লা সেনানিবাসে বোর্ডে একজন বেসামরিক কর্মচারী। সেই সুবাদে সেনানিবাসে কোয়াটারে তাদের বসবাস। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট সোহাগী জাহান তনু কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ইতিহাস বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তাঁর কলেজে নাটকসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথেও জড়িত ছিলেন তনু। টানাটানির সংসারে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের ভিতরেই টিউশনি করে নিজের খরচের কিছুটা যোগাতেন।

চলতি বছরের ২০শে মার্চ বিকেলে টিউশনি করতে গিয়েছিল তনু। কিন্তু রাত আটটাতেও না ফিরলে তাদের মা খুঁজতে রাস্তায় খুঁজতে যান। তনু যে বাসায় পড়াতে যেতেন, সেই বাসায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সন্ধ্যা সাতটাতেই তনু চলে গেছে। রাত দশটার দিকে তাদের বাবা বাসায় ফিরলে তখন আবার তারা খুঁজতে বের হন। যে পথ দিয়ে টিউশনির বাসায় যেতেন, সেই পথেই কুমিল্লা সেনানিবাসের ভিতরে একটি কালভার্টের নীচে তার লাশ পাওয়া যায়।

এ ঘটনায় তনুর বাবা ইয়ার হোসেন পরের দিন কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। প্রথমে কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলাম এর তদন্ত করেন। পরে তদন্তভার দেওয়া হয় জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম মনজুর আলমকে। ১ এপ্রিল তদন্ত দেওয়া হয় সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে। এ ছাড়া তনুর লাশের প্রথম ময়নাতদন্ত হয় ২১ মার্চ। পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশনায় দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত হয় ৩০ মার্চ। এরপর ৪ এপ্রিল প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এতে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করায় এ নিয়ে নানা মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে।

 তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, মেয়ে হারিয়ে আমরা পাগলপ্রায়। মেয়েটির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক। বাসার যে কক্ষে যাই, সেখানেই তার স্মৃতি। এখন বিচারও পাচ্ছি না, সান্ত্বনাও পাচ্ছি না। তাই মেয়ে হত্যার বিচারের জন্য আল্লাহর দিকে তাকিয়ে আছি।

মাহমুদা খানম মিতু:

৫ জুন সকাল সাতটায় নগরীর জিইসির মোড় এলাকায় ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। এ ঘটনার পর বাবুল আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

বাবুল আক্তার ও মাহমুদা খানম মিতু’র বাবাও পুলিশে কাজ করেছেন। প্রায় ১৫ বছর আগের কথা। একই জেলায় পুলিশে চাকরি করতেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল ওয়াদুদ ও পরিদর্শক (ওসি) মোশাররফ হোসেন। সেই সুবাদেই সহকর্মী ওয়াদুদের ছেলে বাবুল আক্তারের সঙ্গে পরিচয়। তার আচার-আচরণে মুগ্ধ হয়েছিলেন মোশাররফ। তিনি সিদ্ধান্ত নেন বড় মেয়ে মাহমুদা আক্তার মিতুর সঙ্গে তার বিয়ে দেবেন। ঊর্ধ্বতন সহকর্মীর মনোভাব শুনে খুশি হন ওয়াদুদও। এরপরই বিয়ে। বিয়ের পর বিসিএস দিয়ে পুলিশে যোগদান করেন বাবুল আক্তার। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সদ্য পদোন্নতি পাওয়া চট্টগ্রামের এসপি বাবুল আক্তারের সঙ্গে ২০০২ সালে ওসি মোশাররফ হোসেনের মেয়ে মাহমুদা খানম মিতুর বিয়ে হয়। ওসি মোশাররফ বর্তমানে ঢাকায় অবসর জীবন যাপন করছেন।

পটুয়াখালীর বাউফলের কাশিপাড়ায় গ্রামের বাড়ি হলেও অবসরকালেই ঢাকার খিলগাঁও মেরাদিয়া ভূঁইয়াপাড়ায় (বাসা নং ২২০/এ) বাড়ি করেন মোশাররফ। সেখানেই মূলত মেয়ে মিতু ও জামাই বাবুলের যাতায়াত ছিল বেশি। ছেলে মাহির ও মেয়ে তাবাসসুমকে নিয়ে সুখেই চলছিল মিতু-বাবুলের সংসার।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা- পরিকল্পিত এবং টার্গেট করেই এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন মিতুকে (৩২) হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। আগে থেকে তার (মাহমুদা খানম মিতু) গতিবিধি লক্ষ্য এবং নজরধারী করছিল সন্ত্রাসীরা। হত্যাকা-র প্রাথমিক আলামত দেখে এ ধারণা করছে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

সুরাইয়া আক্তার রিশা:

২৪ আগস্ট রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিশা (১৪) স্কুলের সামনে কাকরাইল ফুটওভারব্রিজে এক যুবকের ছুরিকাঘাতে আহত হয়। তিনদিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। লিফ‌্যান্ট রোডের বিপণি বিতান ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটের বৈশাখী টেইলার্সের কার্টিং মাস্টার ওবায়দুল খান এ হামলা চালায়।

ওই ঘটনায় রিশার মা তানিয়া বেগম রমনা থানায় একটি মামলা করেন, যাতে টেইলার্সের কর্মী ওবায়েদকে আসামি করা হয়।

তানিয়া বেগম পুলিশকে বলেছেন, ঘটনার কয়েক মাস আগে বৈশাখী টেইলার্সে একটি জামা বানাতে দিয়ে যোগাযোগের জন্য সেখানে তিনি নিজের ফোন নম্বর দিয়েছিলেন। সেই থেকে ওবায়েদ ওই নম্বরে ফোন করে প্রায়ই রিশাকে বিরক্ত করে আসছিলেন।

পুলিশ জানিয়েছে, রিশাকে হত্যার অভিযোগে আটক ওবায়দুল তাদেরকে জানায়, প্রেমের আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় রিশাকে খুন করেছে সে। ওবায়দুল জানিয়েছে, গত ২৪ অক্টোবর হাতিরপুল বাজার থেকে ১৩০ টাকা দিয়ে একটি ছুরি কিনে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সামনে যায় সে। ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে রিশা সড়ক পার হওয়ার সময় তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যা ওবায়দুল। এ সময় কাকরাইলের রাজস্ব ভবনের পাশে ছুরিটি ফেলে দেয়া হয়।

পুলিশ জানায়, রিশার মৃত্যুর প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে ইস্টার্ন মল্লিকা শপিং মলে বৈশাখী টেইলার্স নামে একটি টেইলার দোকানে জামা বানাতে দেয় রিশা। ওই সময় তার মোবাইল নম্বরটিও দেয়া হয়। এরপর থেকে ওই টেইলার্সের কাটিং মাস্টার ওবায়দুল রিশাকে প্রায়ই ফোন করে উত্ত্যক্ত করতো। পরে বাধ্য হয়ে ফোনের ওই সিমটি বন্ধ করে দেয় রিশা। এরপর স্কুলে যাওয়া আসার পথে প্রায়ই রিশাকে বিরক্ত করত ওবায়দুল। সে স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত।

আফসানা ফেরদৌসি:

আফসানা ফেরদৌসির গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নের কানিকশালগাঁওয়ে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আফসানা দ্বিতীয়। আফসানার বাবা আখতার হোসেন ছয় মাস আগে মারা গেছেন ও মা সৈয়দা ইয়াসমিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

২০১০ সালে আফসানা ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পরে ঢাকার শেরেবাংলা মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে সেই কলেজ ছেড়ে দিয়ে ২০১৩ সালে মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় সাইক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নামের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থাপত্য বিভাগে ভর্তি হন। সেনানিবাসের মানিকদী এলাকার একটি বাসায় থেকে পড়াশোনা করতেন তিনি।

গত ১৩ আগস্ট বিকেলে আফসানার লাশ মিরপুরের আল-হেলাল হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যায় দুই যুবক। পুলিশ বলেছে, ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন তেজগাঁও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান ওরফে রবিন পলাতক।
রবিনের সঙ্গে আফসানার প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে জানিয়েছেন উভয়ের বন্ধুরা।

নিতু মন্ডল:

প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্কুলছাত্রী নিতু মণ্ডলকে ধারালো ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে হত্যা করেছে মিলন নামে এক যুবক। ১৮ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। নিতু উপজেলার আইলসাকান্দি গ্রামের নির্মল মণ্ডলের মেয়ে এবং নবগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

পুলিশ, স্থানীয় সূত্র ও স্বজনেরা জানায়, একই এলাকার বিরেন মণ্ডলের বখাটে ছেলে মিলন নিতুকে নানা সময়ে প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার নামে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। বার বার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার বখাটে মিলন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে মিলন তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। নিতু স্কুলে যাওয়ার পথে ধারালো ছুরি দিয়ে গলায় ও পেটে এলোপাতাড়ি আঘাত করে হত্যা করে মিলন।

পাঠকের মতামত

পবিত্র ঈদুল ফিতর আজ

‘ঈদ এসেছে দুনিয়াতে শিরনি বেহেশতী/দুষমনে আজ গলায় গলায় পাতালো ভাই দোস্তি’- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ...