প্রকাশিত: ০৩/১০/২০১৭ ৭:২৯ এএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ১২:৪৫ পিএম

আবদুর রহমান, টেকনাফ থেকে::
খাঁখাঁ রোদ, নিস্তব্ধ দুপুর শাহপরীর দ্বীপ থেকে নৌকা করে হারিয়াখালী ঘাটে পৌঁছেছে একটি রোহিঙ্গা পরিবার। তাদের দেখে অন্যদের চেয়ে অনেক আলাদা মনে হলো। পরনের কাপড় ছিল বেশ ঝকঝকে। অন্যদের সঙ্গে মিল শুধু চোখে-মুখে ফুটে ওঠা আতঙ্ক-উদ্বেগ ও হতাশায়। পরিবারটির প্রধানের নাম মোহাম্মদ রফিক। তার বাড়ি রাখাইন রাজ্যের বুচিডং (বুথেডং) এলাকার সিন্দী প্রাং গ্রামে। তিনি নিজেকে ওই গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান বলে পরিচয় দিলেন। রাখাইনে চেয়ারম্যানকে বলা হয় ওকাট্যা অথবা উসুমু।

গত রোববার দুপুরে সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালীর ভাঙা রাস্তায় তার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে কথা হয়। এ সময় পরিবারের আরও ১০ সদস্য ছিল তার সঙ্গে। অন্য দিনের তুলনায় অনেক গরম ছিল সেদিন। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর মোহাম্মদ রফিকের হাতে ত্রাণ দিতে আসা এক মৌলবি একটি ছোট পানির বোতল তুলে দিলেন। তিনি বোতল থেকে সবাইকে একটু একটু করে পানি খেতে বললেন।

রফিকের কাছ থেকেই জানা গেল, রাখাইন রাজ্যে চলমান হত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অঘ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের কৌশল পাল্টেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এত দিন গুলি, জবাই, আগুন, বোমা, রকেট লঞ্চার, গোলাবারুদসহ সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে রাখাইনের মংডু এলাকায় রোহিঙ্গা নির্মূল করেছে সেনাবাহিনী ও রাখাইনরা। এত কিছুর পরও রোহিঙ্গাদের যারা টিকে ছিল, তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে রাতে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। দিনের বেলায় মাইকিং করে সেনাদের লেলিয়ে দেওয়া রাখাইনরা বলছে, ‘ইয়ান তুয়ারার দেশ ন, তুয়ারার দেশ বাংলাদেশ, তুয়ারা হেরে জোগুই’, অর্থাৎ ‘এটা তোদের দেশ না, তোদের দেশ বাংলাদেশ, তোরা ওখানে চলে যা।’

রফিক জানালেন, তাদের বাড়িতে গত বুধবার হুমকি দিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এর দু’দিন পর, অর্থাৎ গত শুক্রবার সন্ধ্যায় গ্রামে এসে হামলা চালায় রাখাইনরা। সঙ্গে ছিল সেনা ও পুলিশ। হামলা চালিয়ে যাওয়ার সময় এলাকার বেশ কয়েকজন যুবককে ধরে নিয়ে যায় তারা। ওই যুবকদের কী পরিণতি হয়েছে, কেউ জানে না।

মোহাম্মদ রফিক বলেন, মংডু থেকে বুচিডংয়ের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের মতো। সেখানে ৩২০টির মতো গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গার বাস। আগস্টের শেষের দিক থেকে রোহিঙ্গাদের চলে আসা শুরু হলেও টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল যারা, তাদেরও এখন চলে আসতে হচ্ছে। কেননা, এক মাস ধরে এলাকার লোকজনকে চলাফেরা করতে দিচ্ছে না। ফলে সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।

চার দিন আগে বুচিডং এলাকার গুদামপাড়া, হালিজাপাড়া ও জালংপাড়ায় আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। গতকালও টেকনাফ থেকে ধোঁয়া দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে বুচিডংয়ের টমবাজারে গুলি করে ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে সেনারা। এর পর বুচিডংসহ বিভিম্ন গ্রাম থেকে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। ঘরছাড়া রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ আদায় করছে মিয়ানমারের বিভিম্ন বাহিনী।

রফিক আরও বলেন, গ্রামে তার পৈতৃক জমিতে তিনতলা কাঠের বাড়ি ছিল। ছিল ৩০ একর চাষের জমি, পাঁচটি দোকান, ৩০টি রিকশা ও তিনটি চিংড়ির ঘের। সবকিছু ফেলে চলে আসতে হলো প্রাণ বাঁচাতে।


বুচিডংয়ের টাইম্ম্যাখালী গ্রামের লোকমান হাকিমও অভিম্ন বিবরণ দিলেন। রোববার রাতে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার যে দিকটা দিয়ে নাফ নদ গিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে, সেখানে এসে পরিবার-পরিজন নিয়ে নামলেন তিনি। রাতের বেলা নদী পাড়ি দেওয়ার কারণ জানতে চাইলেন লোকমান বলেন, চরম নির্যাতনের পর এলাকার চারটি পুলিশ চৌকিতে ঘুষ দিতে হয় দেশ ছাড়ার জন্য। সেগুলো হচ্ছে ইংকম, পুমালি, তমবাজার ও জাদিপ্রাং পুলিশ চৌকি। সেখানে পুলিশের সঙ্গে রয়েছে রাখাইনরাও। রাখাইনদের হাতেও থাকে অস্ত্রশস্ত্র।

টাইম্ম্যাখালী গ্রামেরই খালেদা বেগম জানালেন, তারা ৫০ জন প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় সীমান্তের পেরাংপুলে মিয়ানমার পুলিশ ধরে রেখেছিল তাদের। সেখানে তাদের দুই ঘণ্টা আটকে রাখে। সেখানে কোনো মারধর করা না হলেও জনপ্রতি ৪০ হাজার কিয়েট (বাংলাদেশি টাকায় দেড় হাজার টাকার মতো) আদায় করে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে।

নৌকার মাঝি আরাফাত উল্লাহ জানান, তার বাড়ি মিয়ানমারের রোংপুল এলাকায়। তিনি প্রতিদিন রোহিঙ্গাদের নৌকায় করে নাফ নদ পারাপার করেন। মিয়ানমার পুলিশ (বিজিপি) তাদের কিছু বলে না। প্রয়োজনে তারা প্রতি টিপে ৫০ হাজার কিয়েট দিয়ে থাকে। তাদের ওপার থেকে এপারে আসতে এক ঘণ্টা সময় লাগে।

টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ বলেন, রাতের আঁধারেই আসছে বেশির ভাগ নৌকা। রোববার রাতে উপজেলার বিভিম্ন সীমান্ত দিয়ে শতাধিক নৌকা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে তিনি স্থানীয়দের কাছ থেকে অবহিত হয়েছেন। সুত্র: সমকাল

পাঠকের মতামত

ছু'রি'কা'ঘাতে মৃ'ত্যুর পথযাত্রী যুবক,টাকা লুট অনিরাপদ ঘুমধুমের টিভি টাওয়ার গরুর হাট

কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক লাগোয়া নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুমের টিভি টাওয়ার গরুর হাটে প্রতিনিয়তই ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা। হাট ...

নিজের সম্মানির টাকা মেধাবী শিক্ষার্থীকে দিলেন নাইক্ষ্যংছড়ির ইউএনও

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকারিয়া নিজের প্রাপ্ত সম্মানির টাকা আর্থিক অনুদান হিসেবে প্রদান করলেন ...