
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের টুপটুপ রেস্টো এন্ড রিসোর্টের নিচতলায় একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ ও তদন্ত কমিটি। এরপর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে, রিসোর্টটির গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা এমন ধারণা করলেও অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে, জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। সুত্র মতে, কমিটিকে ৫ কার্যদিবস সময় বেঁধে দেয়া হলেও তাঁরা মাত্র এক কার্যদিবস তদন্ত কার্যক্রম করতে পেরেছে। দূর্গা পূজার ছুটির কারণে কমিটির কার্যক্রম পিছিয়ে আছে।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাশে ইটের দেয়াল, কাঠ ও বাঁশের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। সেখান থেকে ১০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত রিসোর্টটির দোতলা ও তিনতলার আটটি কক্ষে পর্যটকরা অবস্থান করছিলেন। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার জায়গা।
এদিকে আগুন লাগার সময় রিসোর্টটিতে কতজন ছিলেন, তা নিয়ে স্বজন, প্রশাসন ও পুলিশের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। স্বজনদের ভাষ্য, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার রাতে নারী ও শিশুসহ ২১ জন পর্যটক সেখানে ছিলেন। শনিবার ভোরে আইরিন জাহান ও ইসরাত জাহান সৈকতে বেড়াতে যান। তখন রিসোর্টে ছিলেন ১৯ জন।
ঘটনার পর থেকেই রিসোর্ট মালিক ও মামলার প্রধান আসামি মো. তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক রয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তানভীর বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদসহ অন্যরাও আত্মগোপনে আছেন।
এদিকে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন। তাঁকে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে পুলিশ। এখনো রিমান্ড শুনানি হয়নি।

আগুন যেভাবে লাগে
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া সহকারী ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ ও এখন পর্যন্ত অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য মতে, প্রথমে নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিট হয়। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে।
ওসির ভাষ্যমতে, রিসোর্টের গুদাম ঘরে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ছিল। এর সঙ্গে তীব্র বাতাস ও কাঠের অবকাঠামোর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাসায়নিক পদার্থ সম্পর্কে ধারণা করা হলেও কী ধরনের রাসায়নিক ছিল, তার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ বলেন, আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য আসছে। প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে আরও সময় লাগবে।
এদিকে ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির এক সদস্য দাবি করছেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন ও পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে।
রিসোর্টের পাশের চা দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সকালে বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে তিনি রিসোর্টে আগুন দেখতে পান। লোকজন তখন ছোটাছুটি করছিলেন। আগুনে তাঁর দোকানের একটি ফ্রিজ ও কাঠের কিছু অংশও পুড়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির কক্ষের মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ ছিল কাঠের তৈরি। সড়কের দিকে গাছের খুঁটির ওপর রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশ তৈরি করা হয়েছিল। আগুনে এসব অংশ পুড়ে যায়।
শুধু ট্রেড লাইসেন্স, অন্য কোন অনুমতি নেই
উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে টুপটুপ রেস্টো এন্ড রিসোর্টের ব্যবসা চলছিল। চলতি বছরের ২২ জুলাই তানভীর সুলতান মিয়ার নামে লাইসেন্সটি ইস্যু করা হয়। এতে তাঁর ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মীরপাড়া।
সুত্র বলছে, লাইসেন্সটির মেয়াদ চলতি বছরের পহেলা জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। লাইসেন্স ফি নেয়া হয় ৫০০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর ৭৫ টাকা ও বাণিজ্যিক কর ১ হাজার ৪২৫ টাকা। সব মিলিয়ে মোট দুই হাজার টাকা আদায় করে জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ।
জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ইউনিয়ন এলাকায় ব্যবসা করার জন্য নির্ধারিত ফি নিয়ে ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হয়। টুপটুপের বেলায়ও তাই হয়েছে।
তবে, অগ্নিকাণ্ডের পর তিনি জানতে পারেন, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোন ধরণের অনুমোদন ছিল না।

অতিথি ও আহতের সংখ্যা
আগুন লাগার সময় রিসোর্টে কতজন ছিলেন, তা নিয়ে স্বজন ও পুলিশের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। আর উখিয়া উপজেলা প্রশাসন বলেছে অন্য কথা।
অতিথিদের স্বজনদের মতে, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার রাতে নারী ও শিশুসহ ২১ জন পর্যটক সেখানে অবস্থান করছিলেন। শনিবার ভোরে আইরিন জাহান ও ইসরাত জাহান নামে দুই পর্যটক সৈকতে বেড়াতে যান। তখন রিসোর্টে ছিলেন ১৯ জন।
স্বজনদের হিসাব মতে, রিসোর্টে থাকা ১৯ জনের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ছয়জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। দুজন লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। সেই হিসাবে আরেকজন পর্যটকের সন্ধান মেলেনি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তার হওয়া সহকারী ব্যবস্থাপকের তথ্য অনুযায়ী, আগুনের সময় আটটি কক্ষে ১৯ জন অতিথি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্য দুজন লাফ দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। এই ১৯ জনের বাইরে কেউ নিখোঁজ রয়েছেন, এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার ঘটনাস্থলে জানিয়েছিলেন, অগ্নিকান্ডের সময় রিসোর্টের ভেতরে ১৮ জন অতিথি ছিলেন।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান সাংবাদিকদের বলেন, ১০টি মরদেহ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে এসেছিল। পরে ফায়ার সার্ভিস আবার তল্লাশি চালালেও কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। তারপরও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ আ. মান্নান জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। তাঁরা মাত্র এক কার্যদিবস কাজ করতে পেরেছেন। এখনো তাঁদের হাতে ৪ কার্যদিবস সময় রয়েছে।
তিনি বলেন, পূজার ছুটির কারণে সবাই ব্যস্ত ছিলেন। তাই তদন্ত কাজে সময় দেয়া যায়নি। ছুটির পর তদন্ত কমিটি কাজ করবে।

পাঠকের মতামত