প্রকাশিত: ২৪/০৬/২০১৭ ৭:৫৬ এএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ৫:৪৮ পিএম

মিয়ানমারের শীর্ষ বেসামরিক নেতা, স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি এখনো এশিয়া ও পাশ্চাত্যের মধ্যে দোদুল্যমান রয়েছেন। আর জাতিসঙ্ঘের সঙ্গে বিবাদ মিয়ানমারকে ক্রমবর্ধমান হারে চীনের বাহুতে ঠেলে দিচ্ছে। গত মাসে দি লেডি (তিনি এই নামেই বেশি পরিচিত) পাশ্চাত্যের সমর্থন আদায়ের জন্য যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সুইডেন সফর করেন।
এই সফরের গোপন অ্যাজেন্ডা ছিল আরাকান প্রশ্নে তার সরকারের অবস্থানের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করা, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি তদন্ত করার জাতিসঙ্ঘ উদ্যোগ বাতিল করা। ওই রাজ্যে রোহিঙ্গা নামে পরিচিত মুসলিমদের ওপর নৃশংস নির্যাতন তদন্তে জাতিসঙ্ঘ তদন্ত কমিটি গঠন করতে চাইছে। মিয়ানমার তাদেরকে রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ। তাদের ভাষায় তারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বাঙালি।
চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সু চি (তিনি মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও) যোগ দেবেন কিনা তা নিশ্চিত নয়। তবে তিনি ইতিমধ্যে জোর দিয়ে বলেছেন, তিনি জাতিসঙ্ঘ তদন্ত কমিটিকে কাজ করার অনুমতি দেবেন না। তিনি আশঙ্কা করছেন, তদন্তের পর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হবে। ফলে সমর্থন লাভের জন্য তার কাছে আসিয়ান, চীন ও রাশিয়ার শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
স্কটহোমে অং সান সু চি জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার তথ্যানুন্ধান মিশনের ব্যাপারে তার আপত্তি আবারো তুলে ধরেন। সুইডিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এটা [রাখাইনে] বিভিন্ন সমপ্রদায়ের মধ্যে আরো বেশি বৈরিতার সৃষ্টি করবে। আমরা যে সমপ্রীতি ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি এবং যে ভয় দুই সমপ্রদায়কে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, সেটা দূর করার চেষ্টা করছি, এই মিশন তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই আমরা মনে করছি।’
গত মার্চে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিল নিরপেক্ষ জাতিসঙ্ঘ তথ্যানুসন্ধান মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সময় জাতিসঙ্ঘ এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল মিয়ানমারে, বিশেষ করে রাখাইনে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নির্যাতনের সামপ্রতিক অভিযোগগুলোর ব্যাপারে তদন্তের জন্য কাউন্সিলের সভাপতি ওই মিশন গঠন করেছেন। গত অক্টোবরে ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর (মিয়ানমার অভিযোগ করছে, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এ কাজ করেছে) মিয়ানমার সেনাবাহিনী বেসামরিক লোকজনের ওপর নির্মম দমন অভিযান শুরু করে বলে বিশ্বাসযোগ্য খবর রয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম দিকে মিয়ানমারে জাতিসঙ্ঘ বিশেষ র‌্যাপোটিয়ার অধ্যাপক ইয়াঙকি লি তার বার্ষিক প্রতিবেদনে বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মার্চে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে বক্তৃতাকালে তিনি বলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যে গণহত্যা ও গণধর্ষণ চালিয়েছে, তা ‘খুব সম্ভবত’ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং জাতি নির্মূল অভিযানের মতোই।
প্রতিবেদনটিতে স্থান পাওয়া বেশির ভাগ প্রমাণই মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসঙ্ঘ হাইকমিশনারের তদন্ত থেকে প্রাপ্ত। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ব্যাপক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ওই তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। অ্যাক্টিভিস্ট ও সাহায্য গ্রুপগুলোর মতে, গত অক্টোবরে সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরুর পর প্রায় ৭৫ হাজার রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।
গত সপ্তাহে অধ্যাপক ইয়াঙকি লি আবারো আন্তর্জাতিক, নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, পরিস্থিতি তদন্তে সরকার যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তা মারাত্মকভাবে ত্রুটিযুক্ত। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব উদ্বেগ নিরসনের কোনো সুযোগ নেই। গত মার্চে মংডু তদন্ত কমিশন তিন দিন রাখাইন রাজ্য সফর করলেও সুষ্ঠু তদন্তের কোনো চেষ্টাই করেননি।
লি বলেন, সমপ্রতি সামরিক তদন্তে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে যে আংশিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, তা ভুল বা ভ্রান্ত। আর এ জন্যই নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র তদন্ত প্রয়োজন।
কিন্তু তা সত্ত্বেও অং সান সু চি এবং তার সরকার জাতিসঙ্ঘ তথ্যানুসন্ধান মিশনের দৃঢ় বিরোধিতা করে আসছে। তিনি জোর দিয়ে বলছেন, সাবেক জাতিসঙ্ঘপ্রধান কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত রাখাইনবিষয়ক পৃথক উপদেষ্টা কমিশনই কেবল সুপারিশ করতে পারে এবং তা শোনা যেতে পারে। তিনি সমপ্রতি স্টকহোমে বলেন, আমি মনে করি, শুরু থেকেই নিন্দা না করে তারা কমিশনকে একটি সুযোগ দিয়ে দেখতে পারে, কোথায় যথাযথভাবে কাজ করতে পেরেছে বা কোথায় পারেনি।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রস্তাব করার পরই জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিল তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাস করে। মিয়ানমারের কূটনীতিকরা ইউরোপের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালিয়ে তাদের হুঁশিয়ার করে দিতে থাকে, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের মধ্যে কেবল আরো বেশি প্রতিক্রিয়ারই সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও চীন ও রাশিয়া এ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। স্টেট কাউন্সিলরসহ মিয়ানমারের শীর্ষ মন্ত্রীরা মনে করছেন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি খেলছে। সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যাতে পররাষ্ট্রনীতিতে মানবাধিকারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট রাখে, সেজন্যই কৌশলে বিষয়টি এগিয়ে এনেছে।
এখানেই অং সান সু চির সমস্যার জটিল আকার ধারণ করেছে। সরকারের ঘনিষ্ঠদের মতে, তিনি মনে করছেন, তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মিয়ানমারে ওয়াশিংটন বিশেষভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সু চি চেয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে ডনাল্ড ট্রাম্প জয়ী না হয়ে হিলারি ক্লিনটন জয়ী হন।
জয়ের পর থেকে ট্রাম্প মানবাধিকারের বিষয়ের প্রতি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি ট্রাম্পের একলা চলো নীতিকে তার জন্য অভিশাপ মনে করছেন। ক্লিনটন, বুশ ও ওবামা যেখানে সু চিকে বেশ গুরুত্ব দিতেন, সেখানে ট্রাম্প তাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। এমনকি মিয়ানমারকে এড়িয়ে তিনি চীন ও জাপানের মতো বড় দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। থাই সামরিক নেতা ও প্রধানমন্ত্রী প্রিয়ুত চান-ও-চাকে তার আগে ওয়াশিংটন ও হোয়াইট হাউজে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানানোতে তিনি অপমানিত হয়েছেন।
বিশ্লেষক ও ভাষ্যকাররা মনে করেন, এটা আসলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয়তার পরিণাম। কারণ আগের আমলের শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিকরা পদত্যাগ করলেও তাদের স্থানে নতুনদের নিয়োগ করা হয়নি। এর ফলে মিয়ানমার এবং এশিয়ার অনেক অংশে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির শূন্যতা নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। আর চীন এই শূন্যতার সুযোগটা ভালোভাবেই নিচ্ছে।
এশিয়ার ব্যাপারে ওয়াশিংটনের সুস্পষ্ট কোনো নীতি না থাকার প্রেক্ষাপটে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের’ মাধ্যমে বেইজিং তার ছক কষে ফেলতে পেরেছে। বেইজিংকেন্দ্রিক সম্পর্কের ভিত্তি হলো বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাহায্য। এগুলোই চীনা নীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে, মানবাধিকার রয়েছে অনেক পেছনে। বর্তমানে অং সান সু চির কাছে এটা বেশ আবেদনময়ী মনে হচ্ছে। বেইজিং সক্রিয়ভাবে শান্তি প্রক্রিয়াকে সমর্থন করায় সু চি তার ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়- যেভাবেই হোক না কেন, তার বৃহৎ প্রতিবেশীর দিকেই ক্রমাগত ঝুঁকছেন।
তবে কাজটা তার জন্য সহজ নয়। কারণ তিনি সহজাতভাবেই পাশ্চাত্যের দিকে ঝোঁকপ্রবণ, বিশেষ করে বৃটেনের দিকে। মিয়ানমারে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের (তিনিও অক্সফোর্ড গ্রাজুয়েট) নৈশভোজের সময়ও তিনি বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। বরিস লড আলফ্রেড টেনিসনের কবিতার কয়েকটি লাইনের উদ্ধৃতি দিলে সু চি সেটার বাকি অংশ বলেছিলেন। গত মে মাসে লন্ডনে একটি পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়েও তাকে বেশ উৎফুল্ল দেখা গেছে।
তবে তিনি বাস্তববাদী এবং বিচক্ষণও। তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে পাশ্চাত্য বা চীন কোনো দিকে না ঝোঁকার জোটনিরপেক্ষতা চান। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অবস্থার ফলে চীনের দিকে যাওয়া ছাড়া তার কাছে আর কোনো কিছু করার নেই। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সঙ্গে তার তিক্ততা কেবল চূড়ান্ত উদ্দীপনা লাভ।
সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

পাঠকের মতামত

স্বাভাবিক পথে সেন্টমার্টিনে যাচ্ছে খাদ্যপণ্য, টেকনাফে ফিরছে যাত্রী

অবশেষে স্বাভাবিক হচ্ছে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে নৌযান চলাচল। দীর্ঘ ৩৩ দিন পর টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে যাতায়াত করছে ...