উখিয়ায় ফের সক্রিয় সানাউল্লাহর মানবপাচার সিন্ডিকেট
নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা, সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় হুমায়ুনের মরদেহ

মালয়েশিয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল উখিয়ার যুবক হুমায়ুন কবিরকে। পরিবারের আশা ছিল, বিদেশে গিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরাবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। অভিযোগ উঠেছে, সাগরপথে মালয়েশিয়া নেওয়ার নামে মানবপাচারকারী চক্রের হাতে পড়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন হুমায়ুন। একপর্যায়ে তাকে হত্যা করে মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
নিহত হুমায়ুন কবির কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের গয়ালমারা দক্ষিণ পুকুরিয়া এলাকার আবুল কাশেমের ছেলে।
পরিবারের অভিযোগ, গত ৮ এপ্রিল মালয়েশিয়ায় নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্র হুমায়ুনকে সাগরপথে নিয়ে যায়। বিষয়টি জানতে পেরে পরিবার দ্রুত উখিয়া থানায় একটি প্রাথমিক অভিযোগ দায়ের করে। কিন্তু অভিযোগের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় দালালচক্র মালয়েশিয়াগামী বোট নিয়ন্ত্রণকারী পাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হুমায়ুনকে “চিহ্নিত” করতে বলে। এরপরই তার ওপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন এবং পরে তাকে হত্যা করা হয় বলে দাবি পরিবারের।
নিহতের পিতা আবুল কাশেম অভিযোগ করে বলেন, এলাকাভিত্তিক একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি কামাল উদ্দিন, আলী আহম্মদ, মুহাম্মদ ইসলাম, সৈয়দ আলম কালো ও ড্রাইভার আব্বাস উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, তারা সবাই এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের বাড়ি উত্তর ও দক্ষিণ পুকুরিয়া এলাকায়।
একাধিক স্থানীয় সূত্র জানায়, কামাল উদ্দিন মূলত স্থানীয়ভাবে লোক সংগ্রহের কাজ করতেন। পরে সেই লোকজনকে সানাউল্লাহর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বোটে তুলে দেওয়া হতো। হুমায়ুন কবিরও একই প্রক্রিয়ায় পাচারচক্রের হাতে পড়েছেন বলে দাবি এলাকাবাসীর।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, গয়ালমারা এলাকার মোট পাঁচজন যুবককে একই সঙ্গে মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হুমায়ুনকে হত্যা করা হলেও বাকি চারজনকে দীর্ঘ ৩৪ দিন জিম্মি করে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে পাচারকারীরা তাদের জঙ্গলে ফেলে রেখে যায়। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত একই এলাকার কয়েকজন প্রবাসী ওই চারজনকে উদ্ধার করলে হুমায়ুনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে তারা।
হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছালে পরিবার ও এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।
শুক্রবার (৮ মে) আসরের নামাজের পর গয়ালমারা মসজিদ প্রাঙ্গণে হুমায়ুনের গায়েবানা জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজা শেষে এলাকাবাসী মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তারা প্রশাসনের প্রতি মানবপাচার বন্ধে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
এ সময় বক্তারা বলেন, উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে মানবপাচার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিনিয়ত বহু পরিবার সন্তান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। অথচ মানবপাচার রোধে প্রশাসনের কার্যকর দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ করেন তারা। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন এলাকাবাসী।
উল্লেখ্য যে, উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের জুম্মাপাড়া এলাকার ছেনাম উল্লাহ ওরফে সানাউল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। তার পিতা নাম মোহাম্মদ আমিন। বর্তমানে তিনি লোকমান মার্কেট সংলগ্ন জুম্মাপাড়ায় বসবাস করছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০১১-১২ সালের দিকে মানবপাচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক বনে যান সানাউল্লাহ। অল্প সময়ে গড়ে তোলেন দালানবাড়ি, কেনেন গাড়ি ও বোট। মানবপাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মামলাও রয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।
স্থানীয় এক ইউপি সদস্য জানান, প্রশাসনের তৎপরতা ও ধরপাকড়ের মুখে একসময় গা ঢাকা দেন সানাউল্লাহ। পরে তিনি কারাভোগও করেছেন বলে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। তবে সম্প্রতি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে তার সিন্ডিকেট।
সূত্র আরও জানায়, নতুন করে মানবপাচার কার্যক্রম শুরু করে গত কয়েক বছরে একাধিক ব্যক্তিকে অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে এই চক্র। স্থানীয় কয়েকজনের কাছ থেকে জনপ্রতি চার লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সাগরে নিখোঁজ হওয়া কয়েকজনের ঘটনাতেও তার সিন্ডিকেটের নাম উঠে এসেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু সহযোগীর সহায়তায় সানাউল্লাহ মানবপাচার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মানবপাচার চক্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
এদিকে নিহত হুমায়ুনের পিতা জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। মানবপাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধ বন্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।


পাঠকের মতামত