
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে সক্রিয় মাদক পাচারকারীদের ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত এক বছরে টেকনাফ উপজেলার সীমান্ত ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১২৭ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে নারীসহ অর্ধ শতাধিক রোহিঙ্গা রয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে এক কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার ৫৭০ পিস ইয়াবা উদ্ধার ও দুই হাজার ৩৩৮ জনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে দেশি ও বিদেশি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি,কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১৯৬ জন নিহত হয়েছে। মাদক রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্তে মাদক নিয়ন্ত্রণে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা কঠোর অবস্থানে থাকায় মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আসা অনেকটা কমেছে। তবে সীমান্তের পাহাড় ও নাফ নদীর কাছাকাছি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর কারণে ইয়াবা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে গড়ে উঠছে মাদকের আস্তানা। তৈরি হয়েছে ডাকাতদের বিভিন্ন গ্রুপ। তাদের রয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-শস্ত্র। ক্যাম্পগুলোর অবস্থান ঘিঞ্জি এলাকায় হওয়ায় যখন-তখন অভিযান চালানোও সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি ক্যাম্পে ইয়াবাবিরোধী অভিযানে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গুলিবিদ্ধ হচ্ছেন। সর্বশেষ সোমবার (৩০ ডিসেম্বর) বিকালে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে ইয়াবাবিরোধী অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুই র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। একইদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে র্যাবের একটি দল মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। এসময় বন্দুকযুদ্ধে আনোয়ার সাদেক নামে এক মাদক ব্যবসায়ী ও ডাকাত দলের সদস্য নিহত হয়।
এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘নয়াপাড়া, শালবন ও জাদিমোড়া ক্যাম্প অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বেশ কয়েক দফা ওই ক্যাম্পে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েছে র্যাব। অভিযানের সময় র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি করে সন্ত্রাসী দলের সদস্যরা। সন্ধ্যার পর ক্যাম্প এলাকায় ঢুকতেও ভয় পান অনেকে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র আরও জানায়, সরকার মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালের মার্চের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন। এরপর পরই শুরু হয় সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান। এরই ধারাবাহিকতায় গত একবছরে শুধু টেকনাফ উপজেলায় বন্ধুক যুদ্ধে মারা যায় ১২৭ জন, এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে ৭৮ জন, বিজিবির সঙ্গে ৩৬ জন ও র্যাবের সঙ্গে ১৩ জন। তবে মাদকবিরোধী অভিযানে এপর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় বন্দুকযুদ্ধে মোট নিহত হয়েছে ১৯৬ জন।
পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে প্রাপ্ত গত তিন বছরের (২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের আসার পর শরণার্থী অধ্যুষিত কক্সবাজার জেলায় ইয়াবা আটকের পরিমাণ বেড়েছে। একইসঙ্গে বেড়ে গেছে মাদকের মামলা ও আসামি গ্রেফতারের সংখ্যাও। কোনও কোনও ক্ষেত্রে একবছরের তুলনায় পরের বছর প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক ইয়াবা উদ্ধার বা আসামি গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া গেছে। মামলার পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়, রোহিঙ্গারা আসার পর মাদক চোরাচালান আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ নামে সংগঠনের সমন্বয়ক এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তে মাদক নির্মূলে রোহিঙ্গারাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডাকাত গ্রুপগুলো মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত রয়েছে। এমনকি তারা এখন সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুলি বর্ষণ করছে। তাদের বিরুদ্ধে এখন কঠোর প্রদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এঅঞ্চলে মারাত্মক হারে অপরাধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস বলেন, ‘পুলিশের কঠোর অভিযানের ফলে শীর্ষ ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ফলে এই উপজেলায় ইয়াবা ব্যবসা অনেকটা কমেছে। পুরোপুরিভাবে মাদকমুক্ত করতে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’
র্যাব-১৫ সিপিসি-১, টেকনাফ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, ‘কোন পথ দিয়ে, কীভাবে ইয়াবা আনতে সুবিধা হবে, তা রোহিঙ্গারাই সবচেয়ে ভালো জানে। স্থানীয় মাদক-সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গাদের শুধু পাচারের কাজেই ব্যবহার করছে না, তাদের ক্যাম্পগুলোকে ইয়াবা মজুত ও লেনদেনের ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণ, তারা জানে ক্যাম্পগুলো স্পর্শকাতর এলাকা হওয়ায় সেখানে যখন-তখন অভিযান চালানো অসম্ভব। তবু র্যাব সেখানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অস্ত্রসহ ডাকাতদের আটক করতে সক্ষম হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইয়াবার লেনদেন বেড়ে যাওয়ায় সেখানে টহল জোরদার করা হয়েছে।’
টেকনাফ-২ বিজিবি ব্যটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সল হাসান খান বলেন, ‘সীমান্তে মাদকরোধে বিজিবি রাত-দিন কাজ করে যাচ্ছে। ফলে গত একবছরে বিজিবি সবচেয়ে বেশি মাদক উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। ইয়াবাবিরোধী অভিযানের সময় বিজিবির সঙ্গে গোলাগুলিতে গত একবছরে ৩৬ জন মারা গেছে। এরা বেশিরভাগই ডাকাত ও মাদক ব্যবসায়ী ছিল।’
সুত্র: বাংলা ট্রিবিউন

পাঠকের মতামত