

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) দেশের রাজনীতিতে বরাবরই ব্যতিক্রমধর্মী ও তাৎপর্যপূর্ণ আসন। দীর্ঘ চার দশকের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আসনে যে দলের প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, পরবর্তী সময়ে সেই দলই সরকার গঠন করেছে। এ কারণেই রাজনৈতিক মহলে আসনটি পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘ভাগ্যবান আসন’ হিসেবে। ১৯৮৬ সালে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা নিয়ে আসনটি গঠিত হয়। এর আগে রামু, উখিয়া ও টেকনাফ নিয়ে এটি ছিল চট্টগ্রাম-১৮ সংসদীয় আসন। সীমান্তবর্তী এই জনপদটি বরাবরই জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই আসনের নির্বাচনী ইতিহাসে বারবার ক্ষমতার পালাবদলের চিত্র দেখা গেছে। ১৯৯১ সালে বিএনপি’র শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হয়ে সংসদে যান এবং সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আলী বিজয়ী হলে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে আবারো শাহজাহান চৌধুরীর বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুর রহমান বদি নির্বাচিত হন এবং সরকার গঠনে ভূমিকা রাখেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বদির স্ত্রী শাহিনা আক্তার। এই ধারাবাহিকতাই কক্সবাজার-৪ আসনকে ‘ভাগ্যবান’ হিসেবে পরিচিত করেছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনে চারজন প্রার্থী সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা হলেন বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমেদ আনোয়ারী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা নুরুল হক এবং এনডিএমের সাইফুদ্দিন খালেদ সিংহ। যদিও চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন, মাঠের বাস্তবতায় মূল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই গড়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।
দীর্ঘদিন বিএনপি’র শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার জামায়াত উল্লেখযোগ্য শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে গ্রামেগঞ্জে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। ৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান দেখা গেলেও মাঠের বাস্তবতায় উভয় প্রধান দলের প্রার্থীরাই এখন আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন। স্থানীয় একাধিক সূত্র ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে উভয়পক্ষের ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীরা এলাকাভিত্তিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। গ্রাম ও ওয়ার্ডভিত্তিক বৈঠক, ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ এবং সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ভোট আদায়ের কৌশলে নেমেছেন তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী জানান, উভয়পক্ষ থেকেই তাদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে, নির্বাচনে জয়ী হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো হয়রানি, মামলা কিংবা প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হবে না; বরং তারা নিরাপদে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন, এমন বার্তা দেয়া হচ্ছে। এসব আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে ব্যস্ত উভয় দল। সীমান্ত এলাকার ভোটারদের প্রত্যাশাও স্পষ্ট। উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের ভোটার আবদুল মজিদ বলেন, তারা সৎ ও যোগ্য জনপ্রতিনিধি চান এবং নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান তাদের প্রধান সমস্যা। টেকনাফ পৌরসভার ভোটার রাশেদুল ইসলাম বলেন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। তরুণ ভোটার হুমায়ুন আজাদ আকাশ বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থান ও মাদকবিরোধী কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। এ জন্য অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার প্রয়োজন।
আরেক ভোটার কমরুদ্দিন বলেন, ইয়াবামুক্ত উখিয়া- টেকনাফ এবং রোহিঙ্গা সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে পারবে এমন অভিজ্ঞ, যোগ্য ব্যক্তিকেই তারা ভোট দিতে চান। সব মিলিয়ে ‘ভাগ্যবান’ আসনে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে ভোটের অঙ্ক নতুন করে কষা হচ্ছে। রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে, আর সেই সমীকরণের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। শেষ পর্যন্ত এই ভোটব্যাংক কোন দিকে মোড় নেয়, সেটির ওপরই নির্ভর করবে উখিয়া-টেকনাফের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। উল্লেখ্য, জেলা নির্বাচন অফিসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফের ১১টি ইউনিয়নে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৫৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৮০৬ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮২ হাজার ৮৫২ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১১৫টি।


পাঠকের মতামত