নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি বন্দিদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে কারাগার থেকে রোহিঙ্গা বন্দিদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে কারা কর্তৃপক্ষ। এরই অংশ হিসেবে কক্সবাজারের উখিয়া কিংবা টেকনাফে রোহিঙ্গাদের জন্য বিশেষায়িত কারাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজার,চট্টগ্রাম ও বান্দরবান কারাগারে হত্যা,মাদক ও চোরাচালানসহ বিভিন্ন মামলায় ৭০০-এর বেশি রোহিঙ্গা বন্দি রয়েছেন। ৪০০ বন্দির ধারণক্ষমতার কক্সবাজার জেলা কারাগারে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ২ হাজার ৯৮১ জন। তাদের মধ্যে ৫২৪ জন রোহিঙ্গা। অর্থাৎ,কারাগারটির ধারণক্ষমতার তুলনায় রোহিঙ্গা বন্দির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। একই পরিস্থিতি চট্টগ্রাম ও বান্দরবান কারাগারেও। চট্টগ্রাম কারাগারে অন্তত ২০ জন এবং বান্দরবান কারাগারে ৩০ জন রোহিঙ্গা বন্দি রয়েছেন। সার্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাদের ঝুঁকি হিসেবে দেখছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারা অধিদফতরের ডিআইজি(প্রিজন্স-চট্টগ্রাম)মো. ছগির মিয়া বলেন,‘রোহিঙ্গা বন্দিদের জন্য কক্সবাজারের উখিয়া অঞ্চলে আলাদা স্থাপনা তৈরি করে সেখানে রাখা হলে তারা বাংলাদেশি বন্দিদের সঙ্গে মিশতে পারবেন না। এতে তাদের মাধ্যমে অপরাধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও কমবে।’ কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির আব্দুল মান্নান বলেন,কক্সবাজারের মোট জনসংখ্যার কথা বিবেচনায় নিয়ে যে কারাগার নির্মাণ করা হয়েছিল,সেখানে বর্তমানে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দি রয়েছেন। একই সঙ্গে অপরাধের পরিমাণও দ্বিগুণ হয়েছে। কারা অধিদফতরের ডিআইজি(প্রিজন্স)ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগ করেছেন,রোহিঙ্গা বন্দিদের মাধ্যমে বাংলাদেশি বন্দিরাও মাদক ও বিভিন্ন ধরনের চোরাচালানের পাশাপাশি সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে কক্সবাজারের উখিয়া কিংবা টেকনাফে রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েও রোহিঙ্গা বন্দিদের জন্য আলাদা কারাগার স্থাপনের প্রস্তাবে দ্বিমত রয়েছে পুলিশের। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নিজামুল হক বলেন,‘কোনো নির্দিষ্ট জাতি,বর্ণ বা শ্রেণির মানুষকে আলাদা করে কারাগারে রাখার ব্যবস্থা করা হলে তা কিছুটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।’ বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগার ব্যবস্থাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন আইনজীবীরাও। তাদের মতে,আলাদা কারাগার নির্মাণের পরিবর্তে বন্দিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন,‘রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগার করা হলে তাদের ক্ষেত্রে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যাবে কি না,সে প্রশ্ন রয়েছে। তারা অপরাধী হলে দেশি-বিদেশি পরিচয় যা-ই হোক,অপরাধী হিসেবেই বিবেচিত হবেন। তাই অপরাধীদের জন্য আলাদা কারাগার তৈরির প্রয়োজনীয়তা আমার বোধগম্য নয়।’ অন্যদিকে,চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিক আহমেদ বলেন,‘ঠিকানাহীন কোনো ব্যক্তি অন্য কারও সঙ্গে মিশে তাকে নিজের পথে আসার জন্য প্ররোচিত করতে পারেন। তাই দেশের অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে তাদের আলাদা রাখা উচিত।’ চট্টগ্রাম বিভাগে একটি কেন্দ্রীয় ও ১০টি জেলা কারাগার রয়েছে। এসব কারাগারে বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি বন্দি রয়েছেন। অথচ কারাগারগুলোর মোট বন্দি ধারণক্ষমতা মাত্র ৭ হাজার ৭০০ জন।
পাঠকের মতামত