
তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার
কক্সবাজারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজর এড়াতে ইয়াবাপাচারে একের পর এক নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে মাদক কারবারিরা। আগে পাচারে মাছের ট্রাক, পণ্যবাহী যান বা ব্যক্তিগত গাড়ি বেশি ব্যবহার করা হতো।
এখন ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী বিলাসবহুল এসি ও স্লিপার বাসকে প্রাধান্য দিচ্ছে পাচারকারীরা। ইয়াবাপাচারের জন্য বাসের সিটের নিচে বিশেষভাবে তৈরি করা রয়েছে গোপন চেম্বার (বক্স)। যাত্রীবাহী এসি বাস ছাড়াও ব্যক্তিগত গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতরেও লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে ইয়াবার চালান।
সম্প্রতি কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কক্সবাজার, চকরিয়া, লোহাগাড়া ও রামুতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে একের পর এক ইয়াবার বড় চালান উদ্ধার এবং একাধিক মাদক কারবারি গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক কারবারিরা নিয়মিত কৌশল পরিবর্তন করছে। বর্তমানে তারা চাকচিক্যপূর্ণ বিলাসবহুল বাসকে তুলনামূলক নিরাপদ বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে সহজে সন্দেহের উদ্রেক না হয়।’ তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে টেকনাফ থেকে সরাসরি মাদকদ্রব্য তোলা হয় না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজর এড়াতে মাঝপথের বিভিন্ন স্থান থেকে চালান বাসে তোলা হয়।
শুধু এসি বাস নয়, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে চলাচলকারী ভাড়ায় চালিত প্রাইভেট কার ইয়াবাপাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক একাধিক অভিযানে এসব গাড়ি থেকেও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে।
ঢাকা-কক্সবাজার রুটের চলাচলকারী বিলাসবহুল যানবাহনে ইয়াবাপাচারের বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরে এসেছে কিছু দিন ধরে। ইয়াবার চালান ধরা পড়ার পর। এর পর থেকে পুলিশও নড়েচড়ে বসেছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্র্যান্ডের এসি কোচগুলো কক্সবাজার-ঢাকার রুটে দুই হাজার টাকার বেশি ভাড়া নিচ্ছে যাত্রী পিছু। সেখানে এক হাজার টাকার কমে এসি কোচে কিভাবে যাত্রী বহন করে পুষিয়ে উঠছে তা দেখতে গিয়েই ইয়াবা বহনের বিষয়টি ধরা পড়ে।’ তিনি জানান, এসি কোচগুলোর পাটাতনের নিচে বিশেষ বক্স তৈরি করা রয়েছে। এসব বক্সে ভরে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে। প্রতিটি গাড়ির চালক ও হেলপারদের সহযোগিতায় ইয়াবার চালান পাচার হচ্ছে।
পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দাবি, ঢাকা-কক্সবাজার-টেকনাফ রুটে নামে-বেনামে চলাচলকারী কিছু বিলাসবহুল এসি বাসকে ব্যবহার করছে মাদক কারবারিদের চক্র। কক্সবাজারের পরিবহন শ্রমিক নেতা আবুুল কালাম আজাদ বলেন, পর্যটন মৌসুমে এসব বাস টেকনাফ পর্যন্ত যাতায়াত করে। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি বাস মাত্র সাত থেকে ১০ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। যেখানে একটি বাসে ৪০ থেকে ৪৫ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে এত কম যাত্রী নিয়ে কিভাবে লাভজনকভাবে সেগুলো পরিচালিত হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কক্সবাজার-টেকনাফ বাস মালিক সমিতির সভাপতি ইকবাল শামশুল হুদা টাইডেল বলেন, ‘এসি ও স্লিপার বাসের অনেকগুলোর নির্দিষ্ট কাউন্টার বা পরিচিতি নেই। যেখানে উন্নতমানের এসি নৈশকোচে কক্সবাজার-ঢাকা রুটে দুই হাজার ২০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়, সেখানে কিছু এসি বাস মাত্র ৯০০ থেকে এক হাজার টাকায় যাত্রী পরিবহন করছে।’ এমনকি টেকনাফ সীমান্ত থেকে এসি কোচে ৫০০-৬০০ টাকা ভাড়ায় ঢাকা যাওয়া যায়। অথচ এ রুটে ভালো মানের এসি কোচের ভাড়া আড়াই হাজার টাকারও বেশি। তাঁর মতে, এই অস্বাভাবিক ভাড়ার পেছনে অবৈধ পণ্য, বিশেষ করে মাদকপাচারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কক্সবাজার অফিসের উপপরিচালক মো কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের লোকবলের সংকট রয়েছে। তাই এসব যানবাহনের ফিটনেস ও লাইসেন্স পারমিট দেখা সম্ভব হয়ে উঠে না। তবে মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করা হয়ে থাকে।’ তিনি জানান, সম্প্রতি এক অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্লিপার এসি কোচ থেকে তিন লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। কক্সবাজার-ঢাকা রুটে অর্ধশতাধিক এসি ও এসি স্লিপার কোচ চলাচল করে থাকে। শীত মৌসুমে এ সংখ্যা আরো বেশি হয়ে থাকে।
চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা হানিফ প্লাস পরিবহনের একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে গত ৩ আগস্ট তিন হাজার ৬৬০ পিস ইয়াবাসহ বাসের চালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৭। ওই দিন বাকলিয়া থানার রাজাখালী এলাকার ‘মেসার্স আলম অ্যান্ড সন্স’ দোকানের সামনে থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ইয়াবা বহনে ব্যবহৃত হানিফ প্লাস বাসটি (চট্ট মেট্রো-ব-১১-১২৯২) জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের মধ্যম পাড়ার আবু তালেবের ছেলে বাসের হেলপার মো. মুজিব (২১) এবং পটিয়া উপজেলার জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের পাইরোল সাদার পাড়ার আলী আজগরের ছেলে বাসের চালক মো. আবু হানিফ (২৪)। গত ১০ জুলাই রাতে কক্সবাজার শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ঢাকাগামী একটি বিলাসবহুল স্লিপার বাসে অভিযান চালায় পুলিশ। বাসটিতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে পুলিশ খুঁজে পায় বিশেষভাবে তৈরি করা গোপন চেম্বার (বক্স)। বাসের ৪ ও ৫ নম্বর স্লিপার সিটের নিচে থাকা গোপন চেম্বার থেকে উদ্ধার করা হয় ৯২ হাজার পিস ইয়াবা। এ ঘটনায় বাসের হেলপার শেখ রাতুল (২৩) গ্রেপ্তার হলেও চালক নাজমুল পালিয়ে যান। গত ১৯ জুলাই গভীর রাতে রামুর জোয়ারিয়ানালায় ঢাকাগামী এসি বাসে অভিযান চালিয়ে ৩২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং একজন পালিয়ে যায়। একই দিনে মেরিন ড্রাইভ সড়কে অভিযানে টেকনাফ থেকে আসা ভাড়ায় চালিত প্রাইভেট কারের গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতরে বিশেষভাবে লুকানো ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

পাঠকের মতামত