উখিয়া নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২/০৯/২০২২ ৭:৪২ এএম
ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

মিয়ানমারের অভ্যন্তরের চলমান সংকট ধীরে ধীরে আরও ঘনীভূত হচ্ছে। জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়ছে দেশটির একাধিক ফ্রন্টে বিভক্ত সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের নতুন ‘ট্রাম্পকার্ড’ খুঁজছে তারা। এমন কৌশলে সীমান্তের ওপারের সমস্যাকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়তে তৎপর আরাকান আর্মি। তাদের দাবি, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করতে হলে আরাকান আর্মিকে স্বীকৃতি দিয়ে আলোচনায় বসতে হবে বাংলাদেশকে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এক ধরনের নাটকীয় বার্তা দিল আরাকান আর্মির রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ)। তাদের ভাষ্য, আরাকানের যে কোনো সমস্যা নিয়ে বোঝাপড়া করতে হলে বৈশ্বিক সব ধরনের প্ল্যাটফর্ম থেকে তাদের সঙ্গে বসতে হবে।
বিশ্নেষকরা বলছেন, আরাকান আর্মির এই ধরনের বার্তা দুটি বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়। প্রথমত মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকানে সংগঠনটি শক্ত ভিত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আরেকটি হলো, তারা মিয়ানমারের সংকটের দিকে বিশ্বের দৃষ্টি চায়। এ ছাড়া কেউ কেউ মনে করেন, আরাকান আর্মির এমন ভাষ্য মিয়ানমার সীমান্তের নতুন মেরূকরণের ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত হতে পারে।

সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নজর রাখেন এমন একাধিক বিশেষজ্ঞ সমকালকে বলেন, মিয়ানমারের যত সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে তাদের মধ্যে আরাকান আর্মি অনেক আগে থেকেই সুসংগঠিত। জান্তা সরকারের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কয়েক বছর ধরে তারা আরও শক্তিশালী হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারের যে অংশে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা, সেই এলাকায় তাদের বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ আছে। যদিও রোহিঙ্গাদের কখনোই সমর্থন করেনি আরাকান আর্মি। সশস্ত্র সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের ‘আরাকানি মুসলিম’ বলে অভিহিত করে। তাই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তাদের এক ধরনের দূরত্ব রয়েছে। তবে জান্তা সরকারের মতো রোহিঙ্গাদের নিয়ে তারা বিভিন্ন সময় নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
এ ব্যাপারে নিরাপত্তা বিশ্নেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, যখন রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে, হত্যা ও ধর্ষণ এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বিতাড়িত করা হলো তখন আরাকান আর্মি কোথায় ছিল? প্রতিরোধ তো দূরে থাক, তারা একটা বিবৃতি পর্যন্ত দেয়নি। এখন হঠাৎ করে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কথা বলছে আরাকান আর্মি। এটা তাদের কৌশল। ভূ-রাজনৈতিকভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষ হয়ে কাজ করছে তারা।

প্রায় এক মাস ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ওপাশ থেকে বিকট গোলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। একাধিকবার ওপাশ থেকে ছোড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পাহারা জোরদার করা হয়েছে। এই ধরনের আচরণ বন্ধ করতে কূটনৈতিকভাবে নানামুখী চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া বিজিবির পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তাব এরই মধ্যে মিয়ানমারকে দেওয়া হয়েছে।

উখিয়া নিউজ ডটকমের   সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

এ ব্যাপারে বিজিবির সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন্স) লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান বলেন, আলোচনায় বসতে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল সে ব্যাপারে মৌখিক সম্মতি জানিয়েছে মিয়ানমার। এখন চিঠি চালাচালির মধ্য দিয়ে তারিখ ঠিক হবে। সাধারণ সীমান্তের এই ধরনের সমস্যার আলোচনা ক্যাম্প ও ব্যাটালিয়ন পর্যায় থেকে শুরু হয়। এরপর সেখানে কারও মনে কোনো প্রশ্ন থাকলে তা ধীরে ধীরে ওপরের স্তরে আসে।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, এই ধরনের আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে তাঁরা চান না। তাদের বক্তব্য- মিয়ানমারের সমস্যা তাঁদের অভ্যন্তরে থাকুক। এর জন্য কেন সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকরা ভোগান্তিতে পড়বে।

ঘুমধুমের বাসিন্দা সৈয়দ রহমান হিরা বলেন, গোলাগুলি যখন শুরু হয় কান ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। শিশুরা বেশি ভয় পায়। আর দিনের তুলনায় রাতে শব্দ বেশি পাওয়া যায়। মাসখানেকের মধ্যে বুধবার রাতে গোলাগুলির শব্দ কম পাওয়া যায়। তবে দিনে দু-তিনবার হয়েছে।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মিয়ানমারের ভেতরে এবার নতুনভাবে সংকট শুরু হওয়ার পর সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ বাংলাদেশের। এবার আর কোনো রোহিঙ্গাকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

২০১২ সালে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেয় মোহাম্মদ জুবাই। তিনি এখনও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন এপারে ঝুপড়ি ঘরে বসে। জুবাই জানালেন, বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় যখন থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে তখন থেকেই মিয়ানমার এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সীমান্তে এমন পরিস্থিতি জিইয়ে রাখছে। কারণ মিয়ানমারে এসব গোলাগুলি চলতে থাকলে এপারে আশ্রিত রোহিঙ্গারা কখনও সে দেশে যেতে রাজি হবে না। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায় সেটি বিবেচনা করবে, সে দেশের ফিরে যাওয়ার এখনও পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।

১৯৯৬ সালে মিয়ানমার মংডু থেকে পালিয়ে বর্তমানে আশ্রিত টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মো. আলম জানান, আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার জান্তা মিলে সে দেশে এখনও যসব রোহিঙ্গা রয়েছে তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করে আরাকান রাজ্যে দখল নেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। এখন সময় মগ আর জান্তা সরকার মিলে আমাদের এখানে চলে আসতে বাধ্য করছিল। এই পরিস্থিতিতে সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা অনিরাপদ। যে কোনো সময় তাদেরও এখানে চলে আসতে বাধ্য করবে জান্তারা। তারা চায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি বিতাড়িত করতে।

১৯৯১ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে টেকনাফ নয়াপাড়া আশ্রয় নেয় মোহাম্মদ ইসলাম। তিনি বর্তমানে নয়াপাড়া নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্পের চেয়ারম্যান। তিনি জানালেন, মিয়ানমার জান্তারা রোহিঙ্গাদের মধ্য শিক্ষিত লোকজনকে বেছে বেছে হত্যা করে। এরপর রোহিঙ্গাদের ওপর নিধন চালায়। যখনই রোহিঙ্গাদের ফেরতের বিষয়ে আলোচনা উঠে আসে, তখন কোনো না কোনোভাবে মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করে। এরই একটি অংশ হচ্ছে মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি। সুত্র: সমকাল

পাঠকের মতামত

মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে ৩ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত, আহত ১

মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শান্তিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার সময় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের একটি গাড়ি ...

সীমান্তে মিয়ানমারের ল্যান্ডমাইন, কী করতে পারে বাংলাদেশ?

রোববার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ড এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে এক রোহিঙ্গা কিশোর নিহত ...