কুতুপালংয়ের ডায়েরি

মোহাম্মদ তালুত::
বিস্ময়কর, অবিশ্বাস্য, শ্বাসরুদ্ধকর! আমরা বাংলাদেশিরা কি করতে পারি তা কুতুপালংয়ে এসে নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না! দুনিয়া জুড়ে কত জায়গাই না ঘুরেছি, গিয়েছি, কত কিছুই না দেখেছি! দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছি কতবার! কিন্তু কুতুপালঙের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে এসে পূর্বের সব বিস্ময়ের রেকর্ড ভেঙে গিয়েছে। সামান্য একটু জায়গা, তাতেই আশ্রয় নিয়েছে দশ লক্ষাধিক নিপীড়িত নির্যাতিত রোহিঙ্গা। নির্মম, মনুষ্যত্ববোধহীন মৃত্যুদূত বার্মিজ হানাদারদের কাছ থেকে পালিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করে বার্মার বনবাঁদাড় পেরিয়ে জঙ্গুলে লতাপাতা খেয়ে কোনমতে প্রাণটা নিয়ে এদেশে এসেছে তারা। বাংলার আপামর জনগণ সাথে সাথে আনসারের ভূমিকায় সর্বোচ্চ মানবিকতা প্রদর্শন করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।

হতে পারে আমরা গরীব, কিন্তু এই চিরসবুজ ভূখণ্ডের অধিবাসী কখনই আগত কাউকে স্বাগত না জানিয়ে থাকেনি। হাজার হাজার বছর ধরে এখানে যেই এসেছে, তাকেই সাদরে গ্রহণ করেছে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ। মাত্র দুই মাসে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য বসতি, পানি, খাদ্য, বস্ত্র, শীতবস্ত্র, স্যানিটেশন এমন কিছু নেই যার ব্যবস্থা করা হয়নি। এই অসম্ভব কাজটি সম্ভব করেছেন দেশের প্রশাসন, সেনা, পুলিশসহ সকল স্তরের জনগণ, তাদের সবটুকু ঢেলে দিয়ে। আমার জীবনের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতাগুলোর একটা হল এই ক্যাম্পে সাময়িক সংযুক্তি।

যখন প্রথমবারের মত পাহাড়ের গায়ে সারি সারি অসংখ্য সুসজ্জিত রোহিঙ্গা বসতি দেখলাম, তখন এত অবাক হয়েছিলাম, সেই অবাকত্বের তীব্রতা আমার প্রথম সমুদ্র বা কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের বিহ্বলতাকেও হার মানিয়েছিল।বাকরুদ্ধ হয়ে নিষ্পলক চোখে চেয়েছিলাম অনেক সময় ধরে। প্রাণের তাগিদে মানুষ কি না করতে বাধ্য হয় আর সেই বিপন্নপ্রাণ মানুষকে বাঁচাতে প্রতিবেশী দেশটির মানুষের কতই না প্রাণপণ প্রচেষ্টা! যারা মুহুর্মুহু মানবতার পরাজয়ে বিমর্ষ, তারা এখানে এসে দেখতে পারে মানবতা আজও মরে যায়নি, রোহিঙ্গাদের সবকিছু বিলিয়ে আশ্রয় দিয়ে বাঙালিরা আবার প্রমাণ করেছে তারাও মানবতার মাপকাঠিতে অনেক উপরে।হিপোক্রেট পশ্চিমাদের মত তারা কখনই কোথাও দেদারসে অস্ত্র বিলিয়ে অযুত নিযুত প্রাণের সাথে রক্তের হোলি খেলে মানবতার নির্লজ্জ বুলি ঝাড়েনি। কুতুপালং আসার পর থেকে আমার দেশের মানুষকে আর কোন ভাবেই আমি আর খারাপ বলতে পারব না, মানতেও পারব না। বরং আমি এখন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমার বাঙালির মত মানুষ পৃথিবীতে খুব বেশি দেশে নেই। মধ্যপ্রাচ্যের মূর্খ মানুষগুলোর মাঝে দেদারসে ট্রিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিলিয়ে কোটি তাজা প্রাণের অকাল মৃত্যুর মিছিলের আয়োজন যারা করছে, যাদের ড্রোন প্রতি মুহূর্তে কেড়ে নিচ্ছে লাখো ঘুমন্ত শিশুর কচি প্রাণ, তার পর সামান্য কিছু উদ্বাস্তুকে লোক দেখানো যারা আশ্রয় দিয়েছে, তাদের সাথে এদেশের মানুষের তুলনা হতে পারে না, মানবতার মানদণ্ডে আমরা তাদের চেয়ে অনেক উপরে। আর তাদের তথাকথিত সভ্যতার ওপরে আমার আর বিশ্বাস নেই, অবশ্যই সেটা সত্যিকারের সভ্যতা নয়।জাতিসংঘ দূত-মিয়ানমার-নিষেধাজ্ঞা-রোহিঙ্গা

প্রতিটা রোহিঙ্গার (অবশ্য তারা বলে রোয়াইঙ্গা) মুখপানে চাইলেই খুলে যায় হাজারো পাতার উপন্যাস। একেকটা রোহিঙ্গার সামান্য জীবনের খেরোখাতা যেন পতোন্মুখ মানবতার করুণতম উপাখ্যান। কয়েকদিন তাদের সাথে উঠাবসার ফলে মানুষ সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতার শূন্যপাত্রে সবে শিশিরবিন্দু জমতে শুরু করেছে। বুঝলাম, আসলে জীবন কি! কত ভাল আছি আমরা! মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের কি ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল! তবুও সেসময় আমাদের এক কোটি জনতাকে আশ্রয় দেবার পেছনে ভারতের বিশাল ভূরাজনৈতিক স্বার্থ থাকতে পারে। কিন্তু এইবার এই সুবিশাল রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবার পেছনে বাংলাদেশের কোন স্বার্থই নেই। বাংলাদেশ চাইলেই সীমান্তে পাহারা কড়া করে পাখির মত গুলি করে সবক’টা রোহিঙ্গা খুন করে ফেলতে পারত। কিন্তু তা না করে সবক’টা রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেবার জন্য বাঁধভাঙা স্লুইস গেটের মত সীমান্ত সম্পূর্ণ খুলে দিয়েছে আমাদের বাংলাদেশ।

খরস্রোতের মত কাতারে কাতারে প্রবেশ করেছে তারা, কোন বাধা দেওয়া হয়নি। তারপরের কাহিনী তো রীতিমত ইতিহাস। অনেকেরই জানা নেই। সারা দেশের আনাচে কানাচে থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে অজস্র মানুষ এসে বেঁধে দিয়েছে তাদের জন্য ছাউনি, বানিয়েছে তাদের শৌচাগার, পাহাড়ের গভীরে মাটি খুঁড়ে বের করে এনেছে সুপেয় পানির ধারা, দু’হাত ভরে সাহায্য করেছে যে যা পারে তাই দিয়ে, বিনিময়ে কেউই কিচ্ছুই দাবী করেনি। অকুণ্ঠচিত্তে অমানুষিক খাটুনি খেটে আমার বাঙালি ভাইয়েরা এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে সাহায্য করেছে, সুদূর তেতুলিয়া থেকে এসেও। অনেকের ধারণা, এখানে মুসলিম ভাতৃত্ববোধের একটা চেতনা কাজ করে থাকতে পারে, কিন্তু আসলে আমার বাঙালিরা তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী, গোত্র নির্বিশেষে; কোন বস্তুগত প্রাপ্তির আশায় নয়, স্রেফ মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে। কবিগুরুর অমানুষ বাঙালি (“রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি”) আজ মনুষ্যত্বের মহাসাগরে সত্যি জাহাজ ভাসিয়েছে, ধরেছে কাণ্ডারি। আর এই বাঙালিরই কতই না পিণ্ডি চটকাই আমরা একটু কিছু ঘটলেই! শত সমস্যায় জর্জরিত এই গরীব দেশ যে কিভাবে এত অসহায় মানুষের সহায় হল তা আমার কাছে সর্বযুগের সপ্তাশ্চর্য।

রোহিঙ্গাযে অ্যামেরিকানরা ক্যাটরিনা হ্যারিকেনের সময় গণহারে তাদের নিজের ভিক্টিমদেরই ধর্ষণ করেছে, তারাও আমাদের রোহিঙ্গাদের ট্রিটমেন্ট দেখে স্বীকার করেছে যে, তাদের উচিৎ আমাদের কাছ থেকে ডিজাস্টার হ্যান্ডলিঙের ট্রেনিং নেওয়া। যেসব পুঙ্গব মহাপুরুষ বাঙালির ধর্ষকাম নিয়ে রাতের ঘুম হারাম করে ফেলেছেন তাদের বলতে চাই, আজ অব্দি একটা রোহিঙ্গা শরণার্থীও বাঙালি দ্বারা ধর্ষিত হয়নি, কিন্তু সেটার সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। অসংখ্য ধর্ষিত রোহিঙ্গা নারী এখানে আশ্রয় পেয়েছে, মায়ের মমতায় জড়িয়ে ধরেছে এই দেশ তাদের সবাইকে। এখন প্রায় পনের লাখ রোহিঙ্গার কেউই এখানে এক বেলাও না খেয়ে নেই, কেউ নেই খোলা আকাশের নিচে, সবার জন্য রয়েছে স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন, এমনকি চিকিৎসা সেবাও। রোহিঙ্গারা নিজ বাসভূমেও এমন সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।

আজ বছরের শুরুর দিনটিতে কক্সবাজার উখিয়ার কুতুপালং রিফিউজি ক্যাম্পের ৮ নম্বর ব্লকের পাহাড়চূড়ায় স্থাপিত ক্যাম্প অফিস থেকে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নিপীড়িত রাষ্ট্রহীন লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি বাঙালি জাতির জয়গান গাইছি! মানবতার মহাবিপর্যয়ের মুখে গোটা বাঙালি জাতির প্রতিরোধ ও প্রতিকারের এই পরম আয়োজনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ হতে পেরে আমি যারপরনাই গর্বিত। সাত হাজার একরের এই পার্বত্য অঞ্চলে বিপর্যস্ত মানবতা আজ জেগে উঠেছে, জাগিয়ে তুলেছে আমার বাঙালি জাতি।

সেই জাতির এক সদস্য আমি। যে প্রশাসন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দিনরাত এক করে অবর্ণনীয় পরিশ্রম দ্বারা এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, সেই বাংলাদেশ প্রশাসন সার্ভিসেরও একজন আমি। সর্বোপরি, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নির্দেশনা আর সদয় সম্মতি না থাকলে এমনটা কখনই সম্ভব হত না। বিশ্বমানবতার দরবারে বাংলাদেশকে এমন সুমহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করায় তাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা আর শ্রদ্ধা জানাই। তার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত আর যুগোপযোগী নেতৃত্বের গর্ব এই বাংলাকে করতেই হবে। এইসব বুকভরা গর্ব নিয়ে বছর শুরু করলাম। প্রত্যয় রইল এই গর্ব আরও বাড়িয়ে নেবার। সুত্র: চ্যানেল আই