রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার এবং মিয়ানমারে অধিকার প্রতিষ্ঠা এক নয়

ফারুক খান তুহিন :
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের ৩ সদস্য বিশিষ্ট সত্যানুসন্ধানী দল কর্তৃক ২৭ আগস্ট দেয়া প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নিধনকে স্পষ্ট গণহত্যা উল্লেখ করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে সুপারিশ করেছেন। ফলে বিশ্বব্যাপী এখন আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা । চলমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনেও বিশ্ব মোড়লেরা রোহিঙ্গা সঙ্কট উত্তোরণের বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করছেন। ওন্টারিও ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি জানিয়েছে গত এক বছরে ২৪ হাজার রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হয়েছেন।
এদিকে মিয়ানমার থেকে জোর পূর্বক ঠেলে দিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করার অপরাধকে আমলে নিয়ে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বিচার কাজ শুরু করেছে। অবশ্য প্রসিকিউটর ফাতো বেন সুধা’র করা আবেদনের প্রেক্ষিতে আইসিসি এ বিষয়ে বিচারিক এখতিয়ারের রায় দেয়। জাতিসংঘের ‘গণহত্যা” প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠির তদন্তের ফলাফল বিবেচনা পূর্বক তদন্ত শুরু করেছে আইসিসি। ভোক্তভূগি প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাও বিচারের বাণী শুনতে মরিয়া হয়ে প্রহর গুনছে বাংলাদেশের ঘিঞ্জি শিবিরে।
আইসিসিতে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন পূর্বক তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা দু’টি পৃথক বিষয়। আলাদা দু’টি বিষয়ের সমাধানের প্রক্রিয়াও ভিন্ন ভিন্ন । একটি বিচারিক প্রক্রিয়া আর অন্যটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। বিচারিক প্রক্রিয়াটি সময় সাপেক্ষ। রোহিঙ্গাদের প্রতি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে কিংবা রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে তা প্রমাণ করে সাজা দেওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া।
যদি আমরা আন্তর্জাতিক আদালতের নিকট অতীতের দু’টি বিচার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করি তাহলে বুঝতে সহজ হবে। রোম বিধি’র আলোকে আইসিসি গঠনের পর সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারকাজ শুরু হয়। ২০০৩ সালে দারফুরের যুদ্ধপরাধের মামলায় ২০০৯ সালে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হলেও, ক্ষমতাসীন থাকে বশির। এক যুগের বেশি সময় ধরে বিচার প্রক্রিয়া চললেও সাজা দিতে পারেনি আদালত ।
এর আগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা (আইসিটিআর) রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। ১৯৯৪ সালে মাত্র ১০০ দিনে টুটসি সম্প্রদায়ের ৮ লাখ মানুষকে হত্যার বিচার শেষ করতে আদালতের সময় লেগেছে প্রায় ১৫ বছর। ২০০৮ সালের শেষের দিকে দেয়া রায়ে দেশটির সাবেক সেনা প্রধানসহ ৩ জনকে যাবজ্জিবন কারাদন্ড দেয় আদালত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুদান কিংবা রুয়ান্ডার মত রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের জন্য আদালতে পনেরো-বিশ বছর সময় গড়ালে শরণার্থীরা স্বদেশে কখন প্রত্যাবর্তন হবে? রোহিঙ্গাদের অধিকারইবা প্রতিষ্ঠা হবে কখন? রোহিঙ্গাদের মানবেতর শরণার্থী জীবনটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর কি হচ্ছেনা? বাংলাদেশই বা কত বছর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করবে? আন্তর্জাতিক ডোনাররা কত বছর মানবিক সহায়তা দিয়ে যাবে? আইসিসি অপরাধীদের সাজা দিলেই কি রোহিঙ্গারা স্বাধীকার ফিরে পাবে? বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২৫ থেকে ৪০ লাখ রোহিঙ্গাকে নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দেশে গমণ করার রাস্তা খোলে দিতে আইসিসি বা নিরাপত্তা পরিষদ এখতিয়ার রাখে কি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ধুম্রজালে আবদ্ধ। আইসিসির বিচারে বার্মিজ মিলিটারীর অপরাধীরা সাজা পেতে পারে। ইতিহাস সৃষ্টি ও দৃষ্টান্ত স্থাপন হতে পারে। কিন্তু মিয়ানমারে রোহিঙ্গা অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা সহজলভ্য নয়। তাই বিচারিক প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া দু’টোই সমানে এগিয়ে নিতে হবে। আদালত অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করবে। সংশ্লিষ্ট দেশ, সংস্থা, সংগঠন, ব্যক্তি আইসিসিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিবে।
আর অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার, মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে নিরাপত্তার সহিত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করতে হবে। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের উপর কঠিন থেকে কঠিনতর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। মিয়ানমারের সাথে মিত্রতা বজায় রেখে আন্তর্জাতিকীকরণের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কটের অবসান করতে হবে বাংলাদেশকে। অবশ্য অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞাতার আলোকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে মাথায় রাখতে হবে এটি যেন স্থায়ী এবং শেষ প্রত্যাবাসন হয়। বারবার যেন রোহিঙ্গার বোঝা কাঁধে না ওঠে।
একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, রোহিঙ্গা সঙ্কটের চরম মূহুর্তেও এই জনগোষ্ঠীতে মতানৈক্যতা বিরাজমান। নিজেদের সঙ্কট উত্তোরণের বদলে জড়াচ্ছে সাংগঠনিক আন্তকোন্দলে। রয়েছে সঠিক নেতৃত্বের অভাব। প্রেক্ষিত চিন্তাধারার বদলে ব্রেনওয়াশ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তুচ্ছ বিষয়েও আত্নহননের পথ বেছে নিচ্ছে । অবশ্য শিক্ষার আলো থেকে পিছিয়ে থাকার কারনে এমনটি হচ্ছে । কিন্তু সময়ের স্রোতে পরিবর্তন আনা জরুরী। মিয়ানমারে স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্য ও সঠিক নেতৃত্ব সহায়ক হবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির জন্য।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক – বীরকন্ঠ
ই-মেইল : Faruque.bandarban@gmail.com

 


*
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব উখিয়া নিউজ- এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য উখিয়া নিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।