মাদক সংশ্লিষ্টতা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে জিরো টলারেন্স: আইজিপি

ফাইল ছবি
বাহিনীর সদস্যদের মাদক সংশ্লিষ্টতা, চেইন অব কমান্ড ও শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার প্রশ্নে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেছেন, এসব ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। পুলিশ সদর দফতরে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অপরাধ পর্যালোচনা সভার শেষদিনে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সমাপনী বক্তব্যে আইজিপি এ কথা বলেন।

বৈঠক অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইজিপি তার সমাপনী বক্তব্যে বলেছেন, পুলিশের অনেক সদস্য দেখা যাচ্ছে ইউনিফর্ম পরেই কোনো বিষয়ে ভালোভাবে না জেনে, না বুঝেই অনাকাক্সিক্ষত বা আপত্তিকর নানা বক্তব্য দিচ্ছেন ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যা নিয়ে পুলিশ বাহিনীসহ সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে সতর্ক থাকতে হবে। চাইলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা ইচ্ছা তা-ই বলা যাবে না। পুলিশ বাহিনী একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। এটি ভুলে গেলে চলবে না। একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে পুলিশ বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দেশের জনগণের ক্ষতি হয়। অধস্তন সদস্যদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে হবে। বাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। কোনো পুলিশ সদস্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আইজিপি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়মিত মনিটর করতে হবে, যাতে কোনো সাধারণ নাগরিক সাইবার ক্রাইমের শিকার না হন। তিনি পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের ও পুলিশ বাহিনীর অনুশাসন মেনে চলার নির্দেশ দেন।

বেনজীর আহমেদ বলেন, পুলিশের কোনো সদস্যের মাদকের সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারবে না। কারও যদি মাদকের সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্ট থাকে তা হলে তাকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো পুলিশ সদস্যের মাদক গ্রহণ, মাদক ব্যবসা বা মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্ক প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যেই ডিএমপিসহ বিভিন্ন ইউনিটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্যকে মাদক সংশ্লিষ্টতায় চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনায় দেশ ও জনগণের কল্যাণে দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, সম্প্রতি চট্টগ্রাম, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি-ডাকাতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসেন আইজিপি।

এ সময় আইজিপি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, চুরি-ডাকাতিসহ অপরাধ প্রতিরোধে দেশব্যাপী গ্রামপুলিশ বা চৌকিদারদের সক্রিয় করতে হবে। রাত্রিকালীন চেকপোস্ট ও তল্লাশি বাড়ানোর পাশাপাশি আরও সক্রিয় করতে হবে। আইজিপি বলেন, বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সামাজিক অনেক অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়। বিট পুলিশিংয়ের কারণে বর্তমানে মামলা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে চুরি ও ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে তৎপর হওয়ার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।

এ ছাড়া সম্প্রতি গুলিবিদ্ধ হওয়াসহ নানা কারণে একাধিক পুলিশ সদস্যের ‘আত্মহত্যার’ প্রসঙ্গেও কথা বলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক। এ সময় আইজিপি অধস্তন পুলিশ সদস্যদের সব সমস্যা (পার্ট-১ ও পার্ট-২) ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বসহকারে দেখতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। কনস্টেবলরা যাতে সরাসরি সমস্যা তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বলতে পারেন সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। প্যারেড ও দরবারসহ বাহিনীর কার্যক্রমগুলো আরও বেশি সচল করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শৃঙ্খলার বিষয়টিও কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে।

আইজিপি বলেন, বাহিনীর শৃঙ্খলা ও কল্যাণ এক বিষয় নয়। শৃঙ্খলাকে কল্যাণের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। তবে পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করতেও আমরা যথেষ্ট সচেষ্ট রয়েছি।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো. কামরুজ্জামান জানান, আইজিপি তার সমাপনী বক্তব্যে আরও বলেন, নতুন নীতিমালায় পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ করা হচ্ছে। কনস্টেবল নিয়োগ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। আমরা পাশর্^বর্তী বিভিন্ন দেশ এবং উন্নত অনেক দেশের নিয়োগ নীতিমালা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ পুলিশের উপযোগী কনস্টেবল নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করেছি। ফলে আমরা কনস্টেবল পদে মেধা ও শারীরিক দিক থেকে অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন পুলিশ সদস্য নিয়োগে সক্ষম হবো। অচিরেই পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর এবং সার্জেন্ট পদেও নতুন নীতিমালা অনুযায়ী লোক নিয়োগ করা হবে।

পুলিশপ্রধান সাধারণ মানুষের প্রতি আচরণ বদলানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানুষের প্রতি অমানবিক আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো। আর এটা এক্ষুনি করা যায়। এতে সময় এবং আর্থিক বিনিয়োগ কোনোটিরই প্রয়োজন হয় না। শুধু চাকরি করলে হবে না। চাকরিতে প্রাইড নিয়ে আসতে হবে। এজন্য মানসিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, চাকরির প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে, তা হলেই আমরা এগিয়ে যাব।

আইজিপি মাঠ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, মামলা তদন্তের মান আরও বাড়াতে হবে। তদন্তের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী হতে এবং তদারকি বাড়াতে তিনি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আগামীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যদিকে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব প্রজেক্টে অনেক বিদেশি নাগরিক কাজ করছেন। তাদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন