করোনা ভাইরাস নিয়ে ভয়ে রোহিঙ্গারা

সুজাউদ্দিন রুবেল :
করোনা ভাইরাস আল্লাহর হকুম হবার থাকলে হবে আর আল্লাহর হকুম না থাকলে হবে না। সবই আল্লাহতালার উপর। করোনা ভাইরাস নিয়ে ভয় তো করে, কিন্তু করার কিছুই নেই। মুখে মাস্ক এবং হাত ও পায়ের গ্ল্যাভস নেয়ার টাকা থাকতে হবে তো, তাহলে তো দিতে পারবো। কিন্তু যেখানে দু’বেলা ভালভাবে খেতে পারি না, সেখানে কিভাবে কিনবো মাস্ক ও গ্ল্যাভস?
মঙ্গলবার বিকেলে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৩ বাসিন্দা রোহিঙ্গা মোহাম্মদ জলিল (৪০) এভাবেই করোনা ভাইরাস নিয়ে বলছিলেন তার ভয়ের কথা।
মধুরছড়া ক্যাম্পে ত্রাণ নিতে আসা ক্যাম্প-৪ এর রোহিঙ্গা লোকমান হাকিম (৫০) বলেন, ত্রাণ নিতে সকালে চাপটা বেশি থাকে। সকালে ১০০ থেকে ১২০ জন মত রোহিঙ্গা একসাথে ত্রাণ নেই লাইনে দাঁড়িয়ে। বলতে গেলে ত্রাণ নিতে রোহিঙ্গারা আসতেও থাকে আর ত্রাণ দিতেও থাকে। ভাইরাসের নাম শুনেছি, ক্যাম্পে শুধু হাত ধোঁয়ার জন্য সাবান দিয়েছে, এছাড়া আর কিছুই দেয়নি।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) উখিয়া কুতুপালং ক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা অবাধে চলাফেরা করছে। কেউ কেউ গ্রুপ বেধে আলাপ-আলোচনা করছে। আবার কেউ কেউ বাজার-সদায় করতে ব্যস্ত। কারো মুখে নেই মাস্ক কিংবা হাতের গ্ল্যাভস। লাইনে দাঁড়িয়ে একে অপরের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে নিচ্ছে ত্রাণসামগ্রী। পুরো ক্যাম্প জুড়ে একই অবস্থা।
বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী অধ্যুষিত জনপদ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা। এ দুই উপজেলার ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। ব্যাপক জনঘনত্বের এই শিবিরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে তার পরিণাম ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা। তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই অসচেতন। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে রোহিঙ্গাদের সচেতন করা হচ্ছে।
টেকনাফ হ্নীলা ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গারা মাঝে-মধ্যে মিয়ানমার পারাপার করে থাকে। তাছাড়া মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সীমান্ত রয়েছে, আর রোহিঙ্গারা চোরাপথে মিয়ানমারে আসা-যাওয়া করে। সেজন্য আমাদের ঝুঁকিটা অনেক বেশি। তাই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেশি নজরদারির দাবি জানান তিনি।’
শরণার্থী রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের কেন্দ্রীয় সচিব মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ক্যাম্পে ১১ লাখ রোহিঙ্গার অবস্থান। তারা কোনভাবেই ক্যাম্পের বাইরে যেতে পারছে না অনুমতি ছাড়া। ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা বের হতে না পারলেও বিদেশি এবং স্থানীয়রা প্রবেশ করছে। যার কারণে আমরা অনেক আতংকে আছি। কারণ তাদের কাছ থেকে আমাদের রোহিঙ্গা কমিউনিটিতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে তার জন্য ভয়ে আছি। করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বাকি আছে মাত্র শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেহেতু ঘেষাঘেষি মানুষ, সেখানে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বেশি মানুষ মারা যাবে সেজন্য বেশি ভয়ে আছি।
তবে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত শিবিরের কারোর মধ্যে করোনা ভাইরাসের কোনও লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তবে তেমনটা দেখা গেলে রক্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা করে রাখার জন্য শরণার্থী শিবিরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় ইতোমধ্যে ৪৭টি এবং রামু ও চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ১০০টি শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে।
টেকনাফ লেদা শরণার্থী শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলম বলেন, করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষায় হাত ধোয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম করতে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি শিবিরে যাতে কোনও লোকসমাগম না হয় সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।
অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন এসএম শামসুজ্জোহা জানান, করোনা মোকাবেলায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও নেয়া হয়েছে বিশেষ নজরদারি। সেই পরিপেক্ষিতে নতুন ৩২ ও পুরাতন দুইটি সহ ৩৪টি ক্যাম্পে নতুন করে বিদেশ থেকে আগতদের নিষেধ করা হয়েছে। যারা এসেছেন তাদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত চেক করা হচ্ছে। এছাড়া যারা বিদেশি নাগরিক রয়েছে তাদের ক্যাম্পে যাতায়াতে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসমাগম এড়াতে রয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। বিশেষ করে, স্কুল-মাদ্রাসাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করা দেয়া হয়েছে। ক্যাম্পে কোন প্রকার জনসমাগম যাতে না হয় সে বিশেষ সংশ্লিষ্টদের বরাবরে নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ডিস্ট্রিবিউশনে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি না হলে বিতরণ বন্ধ রাখার জন্য বিভিন্ন ক্যাম্পে ইতিমধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী কাজ চলছে। আশা করছি সবাই মিলে করোনা প্রতিরোধে সক্ষম হবো।
শামসুজ্জোহা আরও জানিয়েছেন, যারা দৈনন্দিন রেশন বিতরণ করে সেক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বিতরণ করতে হবে। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য ও এলপি গ্যাস বিতরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দেশীয় এনজিওগুলো কাজ করছে। ইতিমধ্যে মিটিং করে সতর্কতা অবলম্বন করতে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
গত সোমবার (২৩ মার্চ) ভারত হতে অবৈধভাবে আসা এক রোহিঙ্গা পরিবারের ৪ সদস্যকে ইউএনএইচসিআরের ট্রানজিট ক্যাম্পে কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হয়েছে।

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন