

নীল জলরাশি, প্রবাল আর সবুজের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা সেন্টমার্টিন। দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপের সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এর নাজুক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক বর্জ্য ও পরিবেশদূষণের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দ্বীপটিকে সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই রাখতে নেওয়া হয়েছে ২০ হাজার বৃক্ষরোপণ ও সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উদ্যোগে নেওয়া এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি। শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টায় সেন্টমার্টিন দ্বীপে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সহযোগিতায় কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।
সরকারের ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচিকে সফল করার লক্ষ্যে ৮ থেকে ১০ আগস্ট ৩ দিন ব্যাপী সেন্টমার্টিনে ২০ হাজার চারাগাছ রোপণ ও সমুদ্রসৈকত পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বৃক্ষরোপণ। দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করা হচ্ছে ২০ হাজার চারাগাছ। এর মধ্যে রয়েছে আমকলম, পেয়ারা, বহেরা, হরতকি, নিম, বাতাবি লেবু, কুল, কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, জারুল, সাগরলতা, হরগজা, কেয়া ও নারিকেল।
তবে শুধু গাছ লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না কর্মসূচি। রোপণ করা চারার পরিচর্যা ও সুরক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃরোপণ এবং চারার বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি সেন্টমার্টিনের সৈকতকে প্লাস্টিক বর্জ্যমুক্ত রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সমুদ্রসৈকতে ফেলে রাখা আবর্জনা, বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। স্থানীয় জনগণ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, স্বেচ্ছাসেবক, জনপ্রতিনিধি, যুবসমাজ ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবেশদূষণ কমানো এবং সেন্টমার্টিনে পরিচ্ছন্ন ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ গত তিন বছরে সারা দেশে ৩২ লাখ বৃক্ষরোপণ করেছে। সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে সফল করার লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ৭৫ লাখ বৃক্ষরোপণের বৃহৎ পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে সংস্থাটি।
২০২৬ সালে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ সারা দেশে মোট ১৫ লাখ বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার জেলায় আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালে কক্সবাজার জেলায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০টি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে টেকনাফে ৬৫ হাজার, উখিয়ায় ৮২ হাজার, রামুতে ১৩ হাজার ৮৭০ এবং কক্সবাজার সদরে ১০ হাজার ২০০টি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের মাধ্যমে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ কমাতে, অক্সিজেন সরবরাহ বাড়াতে, মাটির ক্ষয়রোধ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বনায়ন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলাধার রক্ষা এবং মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে।
প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “সেন্টমার্টিন আমাদের দেশের একটি অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আধার। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের বিরূপ প্রভাব থেকে এই দ্বীপকে সুরক্ষিত রাখতে বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বৃক্ষরোপণ করলেই হবে না, রোপণ করা গাছগুলোর যথাযথ পরিচর্যা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সেন্টমার্টিনকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই রাখতে সরকার, স্থানীয় জনগণ, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও এনরুট ফাউন্ডেশনসহ বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনের পর আলোচনা সভায় রোপণ করা চারার পরিচর্যা ও সুরক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃরোপণ এবং চারার বেঁচে থাকার হার পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এনরুট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. তারিকুল হক, হেড অব প্রোগ্রাম জুবায়ের ইবনে হাসনাত অভি, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কক্সবাজার এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেশন অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার রোনাল্ড প্রবীর চিসিক, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের লাইভলিহুড ম্যানেজার মোহাম্মদ রুহুল আমিন, চাইল্ড সেইফটি নেট প্রজেক্টের কো-অর্ডিনেটর ছোটন বড়ুয়া, টেকনাফ এপি ম্যানেজার প্রণয় পালমা, সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা।
সেন্টমার্টিনকে সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই রাখতে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের এ উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্ব পেয়েছে। বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ এবং রোপণ করা গাছের পরিচর্যা ও সুরক্ষার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দ্বীপটির পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের বিষয়টি সামনে এসেছে।

পাঠকের মতামত