প্রকাশিত: ১৫/০১/২০১৮ ৮:৩৮ এএম , আপডেট: ১৭/০৮/২০১৮ ৮:০৪ এএম

উখিয়া নিউজ ডেস্ক::
খোলাবাজার থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে ডাল কিনে প্যাকেটে ভরে রোহিঙ্গাদের দিয়ে প্রতি কেজি ডালের প্যাকেজিং খরচ দেখানো হচ্ছে ৯৩ টাকা! শুধু ডাল প্যাকেটজাত করে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করে বাড়তি খরচ দেখিয়ে ১৭ লাখ টাকা পকেটে ভরেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল। প্রতি রোহিঙ্গা পরিবারকে ২০০ টাকা দামের দুটি করে গামছা দেওয়ার কথা বাংলাদেশি এনজিও অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের।

৮০ টাকায় একেকটি গামছা কিনে দুই টুকরো করে দুই প্যাকেটে ভরে দুটি গামছা হিসেবে বিতরণ করছে তারা। হত্যা-নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের এভাবে ঠকিয়ে রমরমা বাণিজ্য করছে অন্য এনজিওগুলোও।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে এনজিওগুলোর ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে এমন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে এক সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন গত ৪ জানুয়ারি এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর পাঠিয়েছেন ওই প্রতিবেদন। তাতে বেশ কয়েকটি এনজিওর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এনজিওগুলো কেবল আর্থিকভাবেই অনিয়ম করছে না, তারা এখতিয়ারবহির্ভূত কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। দোষী এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন তিনি।

মন্ত্রিপরিষদসচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কাছেও প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছেন চট্টগ্রামের ডিসি। প্রতিবেদনে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল, অগ্রযাত্রা বাংলাদেশ, কাতার চ্যারিটি, আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন, সোশ্যাল এজেন্সি ফর ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট ইন বাংলাদেশ (ছওয়াব), প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, নেটওয়ার্ক ফর ইউনিভার্সেল সার্ভিসেস অ্যান্ড রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট (নুসরা), দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ইউনাইটেড সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্টের (ঊষা) বিরুদ্ধে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নুসরা, দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ঊষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, এরা এনজিওবিষয়ক ব্যুরো থেকে কোনো ধরনের ত্রাণ সরবরাহের বরাদ্দপত্র পাচ্ছে বা কোনো ধরনের ত্রাণ সরবরাহ করছে সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনকে কিছুই জানাচ্ছে না।

এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. শাহাদাৎ হোসাইন গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণে ৯টি এনজিওর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সব এনজিওর কাছেই আমরা ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে সবাইকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার অংশ হিসেবে আমরা তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে তখন আমরা ব্যবস্থা নেব। ’

৯টি এনজিওর অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে কক্সবাজারের ডিসি মো. আলী হোসেন বলেছেন, বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য ৯০টি এনজিও জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম

চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু এনজিওর কার্যাবলিতে অনিয়ম পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনালের ১৩৩ টাকা দরের ডাল বিতরণ করার কথা। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তারা ৮৫ টাকা কেজি দরের তীর মার্কা ব্র্যান্ডের কিছু ডাল কিনেছে। আর বাকি ডাল কিনেছে খোলাবাজার থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে। তারা এই ডালের প্যাকেজিং খরচ ধরেছে ৯২ টাকা ৯৬ পয়সা। জেলা প্রশাসকের সরেজমিন তদন্ত করতে যাওয়া দলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ডাল প্যাকেজিংয়ে খরচ হওয়ার কথা বড়জোর ১৬ টাকা। তদন্তদল হিসাব করে দেখেছে, এনজিওটি শুধু ডাল প্যাকেজিংয়ে বেশি খরচ দেখিয়ে ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া এনজিওটি জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই চাইল্ড রিক্রিয়েশন সেন্টার নির্মাণ করেছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর ওয়েবসাইটে দেখা যায়, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি এনজিও। সেখানে একটি টেলিফোন নম্বর রয়েছে। গতকাল বিভিন্ন সময়ে ওই টেলিফোন নম্বরে কল করা হলেও কেউ তা রিসিভ করেনি। আর সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের ওয়েবসাইটে গিয়ে যোগাযোগের জন্য আরেকটি টেলিফোন নম্বর পাওয়া যায়। সেটি বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সম্পর্কে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনজিওটির ১৪০ টাকা কেজি দরের পাঁচ কেজি করে ডাল দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা ৭০ টাকা কেজি দরের তিন কেজি করে ডাল দিচ্ছে। এ ছাড়া ২০০ টাকা দামের দুটি গামছা দেওয়ার কথা থাকলেও ৮০ টাকা দামের একটি গামছা ছিঁড়ে দুই টুকরো করে দুই প্যাকেটে দেওয়া হয়েছে। ৩২০ টাকা দামের একটি ডাস্টপ্যান, ব্রাশ ও ডাস্টবিন দেওয়ার কথা থাকলেও ৪৫ টাকা মূল্যের ময়লার ছোট ঝুড়ি ও বেলচা দেওয়া হয়েছে। অন্য দ্রব্যসামগ্রীর মানও অনুমোদিত দাম অনুসারে পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রামের জামাল খান রোডের ঠিকানায় নিবন্ধিত এনজিওটির ফোন নম্বরে কল করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন মতে, প্রতিটি ২৮ হাজার টাকা মূল্যের এক হাজার তাঁবু দেওয়ার কথা কাতার চ্যারিটির। কিন্তু দিয়েছে প্রতিটি ২৪ হাজার টাকা মূল্যের। মূল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঁচ হাজার পরিবারের জন্য ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা স্থাপন করতে জেলা প্রশাসন থেকে নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো এনজিওটি তা করেনি। এ ছাড়া সংস্থাটির রান্না করা খাবার সরবরাহ করার কথা থাকলেও প্রথম কয়েক দিন দেওয়ার পর এখন শুকনো খাবার সরবরাহ করছে। এ বিষয়েও জেলা প্রশাসনকে কিছু জানায়নি এনজিওটি।

কাতারভিত্তিক এনজিওটির উল্লেখ করা টেলিফোন নম্বরে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ছওয়াব নামের একটি এনজিওর ১১ লাখ টাকার ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার কথা। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে সরেজমিনে গিয়ে সেখানে মাত্র চার লাখ টাকার ত্রাণসামগ্রী দেখা যায়। তখন চার লাখ টাকার ত্রাণ ছাড় করেনি জেলা প্রশাসন। পরে এনজিওটি বাকি সাত লাখ টাকার ত্রাণ নিয়ে আসে।

আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের নামে ১৮টি বরাদ্দপত্র পায় তদন্তদল। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিওটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রথম দিকে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে তথ্য জানানো হতো। তবে কিছুদিন ধরে এনজিওটি তা আর জানাচ্ছে না। এ ছাড়া এনজিওটি মধ্যরাতে গ্যাস সিলিন্ডারের ট্রাক নিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢোকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার একটি ঠিকানায় নিবন্ধিত এই সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া টেলিফোন নম্বরটি বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের তিন হাজার টাকা দামের ডিগনিটি কিট্স দেওয়ার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসনের তদন্তদল সরেজমিনে গিয়ে ৯০০ টাকার ডিগনিটি কিট্স পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন থেকে ডিগনিটি কিট্স সরবরাহের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক।
সুত্র: কালেরকন্ঠ

পাঠকের মতামত

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যৌথ অভিযান: সন্ত্রাসী জিয়াউর রহমানসহ আটক ১৭

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ আশপাশের বিভিন্ন ব্লকে সমন্বিত এক বিশাল যৌথ অভিযান ...

টেকনাফে জনতার বিক্ষোভের মুখে গণশুনানি পন্ড; কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতা অবরুদ্ধ!

“ইউনিয়ন বিভক্তি হলে আমরণ অনশন করবো” “বর্গকিলোমিটারের অজুহাতে ইউনিয়ন বিভক্তি চাই না” “ইউনিয়ন বিভক্তি হলে ...

কক্সবাজারে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা গাইডলাইন অনুমোদন

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জীবন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা (এলএসবিই) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গাইডলাইন উপস্থাপন ও অনুমোদনবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত ...

ইয়াবা কারবার, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আতঙ্কে উখিয়া-টেকনাফ

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সংঘবদ্ধ অপরাধ, সশস্ত্র তৎপরতা ও অপহরণ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের ...
Single Page Footer