
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) রক্ষায় কঠোর নির্দেশনা দিয়ে রায় দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ঐ রায়ে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ইজারা না দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আগামী দিনগুলোতে সরকারের এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। এই রায়ে কক্সবাজারের ঝিলংজা মৌজার কোনো জমি ভবিষ্যতে ইজারা না দিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিলের পর এই মৌজার যে সকল ভূমি ইজারা দেওয়া হয়েছে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে ইজারা নেওয়া ভূমিতে গড়ে উঠা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঐ স্থাপনার মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে সরকারকে বলেছে আদালত।
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা রক্ষা নিয়ে করা মামলার রিভিউ পিটিশনের রায়ে এমন নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ। রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, আপিল বিভাগের এই রায়ের ফলে ঝিলংজা মৌজার সমুদ্রসৈকতে লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত হোটেল-মোটেলসহ গড়ে উঠা বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে অপসারণ করতে হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, যে কোনো মূল্যে পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে। এই রায়ে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে কেউ যদি আদালতের এই রায় লঙ্ঘন করে তাহলে আদালত অবমাননার অভিযোগে পদক্ষেপ নিতে পারবে। লিজ গ্রহীতাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার ইমরানুল কবীর বলেন, ১৯৯৯ সালের পর ঝিলংজা মৌজায় বেশির ভাগ হোটেল-মোটেল গড়ে উঠে। এখানে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে। এসব স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলে পর্যটন শিল্পে প্রভাব পড়বে। আর ক্ষতিপূরণ দিয়ে স্থাপনা ভেঙে ফেলাটাও সরকারের জন্য অনেক ব্যয়সাপেক্ষ হবে। এ মামলার অন্যতম আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ইসিএ এলাকা হিসেবে ঘোষণার পরেও ঝিলংজা মৌজায় ভূমি লিজ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। আইন অমান্য করে যেসব সরকারি কর্মকর্তা লিজ দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রায়ে থাকলে ভালো হতো।
এ রায়কে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী (বেলা) অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকারের এক মন্ত্রণালয় কিছু এলাকাকে ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করেছে। আবার অন্য মন্ত্রণালয় ঐ আইন অমান্য করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণে অনুমতি দিচ্ছে। কিন্তু সরকারকে তো নিজের ঘোষণা নিজেকে মানতে শিখতে হবে। আমি মনে করি এই রায় ইসিএ রক্ষার জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
যেভাবে উৎপত্তি মামলার :২০০৩ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিগত চারদলীয় জোট সরকার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন ১৩০ একর সরকারি খাস জমি নিয়ে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলে। যদিও ঐ এলাকা ইসিএর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপরেও ঐ জমিতে ৮৭টি প্লট তৈরি করে ঐ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। পরে সরকার ঐ লিজ বাতিল করে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা হাইকোর্টে যায়। হাইকোর্ট সরকারি সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। হাইকোর্টের ঐ রায় আপীল বিভাগেও বহাল থাকে।
ইসিএর অন্তর্ভুক্ত ১৩ এলাকা : দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুসারে বিভিন্ন সময়ে ১৩টি এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন, কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, সোনাদিয়া দ্বীপ, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, মারজাত বাঁওড়, ২০০১ সালে গুলশান-বারিধারা লেক, ২০০৯ সালে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী এবং ২০১৫ সালে জাফলং-ডাউকি নদীকে ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করে। ঐ ঘোষণায় এসব এলাকার ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট/পরিবর্তন করতে পারে এমন সকল কাজ নিষিদ্ধ করা হয়। প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংসকারী সকল প্রকার কার্যকলাপ এবং মাটি, পানি, বায়ু এবং শব্দ দূষণকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপনসহ বিভিন্ন কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করে সরকার।

পাঠকের মতামত