প্রকাশিত: ০৪/১২/২০২০ ৯:১৭ এএম

রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর বাংলাদেশের যৌক্তিক ও মানবিক সিদ্ধান্ত বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বরং জাতিসংঘের ভূমিকাই রহস্যজনক এবং অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন তারা। তাদের মতে, গত তিন বছরে শুধু মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ছাড়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। এমনকি বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর যতটা চাপ দেওয়া দরকার তা দেয়নি। বরং রোহিঙ্গা সংকটকে পুঁজি করে তারা নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে। ভাসানচরে স্থানান্তর চূড়ান্ত সমাধান না হলেও এটিকে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মত দিয়েছেন তারা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেছেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর নিয়ে জাতিসংঘের আপত্তি অযৌক্তিক। বরং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাখাইনে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির দিকে তাদের নজর দেওয়া উচিত।
কেন ভাসানচর :২০১৭ সালে রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর গণনিষ্ঠুরতা ও গণহত্যা শুরু হলে সেখান থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় রোহিঙ্গারা। ২০১৭ সালের আগেই প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়ায় ক্যাম্পে ছিল। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা একসঙ্গে এলে তাদেরও কক্সবাজারের ক্যাম্পেই আশ্রয় দেওয়া হয়। স্বল্প পরিসরে গাদাগাদি করে অনেকটা মানবেতরভাবে থাকতে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ব্যবসার মতো নানা অপরাধ কার্যক্রমও বাড়তে থাকে। সম্প্রতি ক্যাম্পের ভেতরে অবৈধ ব্যবসার দখল নিয়ে একাধিক গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে কক্সবাজারের ভূ-প্রাকৃতিক, পরিবেশ এবং স্থানীয় অধিবাসীদের জীবন-জীবিকাসহ সার্বিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ওপরও।
অন্যদিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গত তিন বছরে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে কার্যকর উদ্যেগ নিতে ব্যর্থ হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সীমিত আকারে কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও আরেকদিকে ক্রমাগত মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে মাঝেমধ্যে উচ্চকণ্ঠ হলেও কার্যত মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। ফলে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেও নির্দি্বধায় পাশ কাটিয়ে গেছে।

রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গারা যেভাবে আছে তার চেয়ে আরও ভালোভাবে জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করতেই তাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা হচ্ছে। সেখানে তাদের জন্য বসবাসের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, জীবিকার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন করে বিশ্নেষকরা বলছেন, দুনিয়ার আর কোথাও সম্ভবত বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য এত ভালো থাকার ব্যবস্থা করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের চোখে ভাসানচর :নিরাপত্তা বিশ্নেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার প্রায় এক বছর আগে নিজের উদ্যোগেই ভাসানচর পরিদর্শন করে এসেছেন। তিনি গতকাল সমকালকে বলেন, ভাসানচরে তিনি অত্যন্ত আধুনিক ও নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ দেখেছেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, উন্নত পয়ঃনিস্কাশন, সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা এবং জীবিকারও সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজারে ক্যাম্পে বরং রোহিঙ্গারা গাদাগাদি করে কষ্টকর জীবনযাপন করছে। এ কারণে পরিদর্শনের পর তিনি দৃঢ়তার সঙ্গেই রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করা উচিত বলে মত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ভাসানচরে সুব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরও রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বাধা এসেছে একাধিক সুবিধাভোগী পক্ষের কাছ থেকে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরেই এই সুবিধাভোগী গ্রুপ তৈরি হয়েছে। একদল আছে যারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র চোরাচালান, নারী পাচারের মতো কর্মকাণ্ড করছে। তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের একটা অংশ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ক্যাম্পের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই এ ব্যবসা চলছে বলে তথ্য এসেছে। এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। তার প্রমাণ ক্যাম্পের ভেতরে ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ব্যবসা নিয়েই সংঘর্ষ হচ্ছে বলে খবর আসছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কক্সবাজারে ক্যাম্পের ভেতরে রাতে পুলিশ পর্যন্ত ঢুকতে বাধা পায়। রাতে ক্যাম্পের ভেতরে কী হচ্ছে কেউ জানতে পারছে না। এ অবস্থা সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি করেছে। এভাবে চলতে পারে না, চলতে দেওয়া উচিত নয়। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর সরকারের সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।
জাতিসংঘের অবস্থানের সমালোচনা করে মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে জাতিসংঘ যে ধরনের বিবৃতি দিয়েছে, তা যুক্তিসঙ্গত নয়। জাতিসংঘ আসলে কী চাচ্ছে সেটাও পরিস্কার নয়। যদি রোহিঙ্গাদের ভালোভাবে জীবনযাপনের সুযোগ চায়, এর জন্য ভাসানচরের চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। জাতিসংঘ গত তিন বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো কার্যকর ভূমিকাই নিতে পারেনি। এ অবস্থায় ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিরোধিতা এমন ইঙ্গিতও দেয়, জাতিসংঘ প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায় না। এ সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে চায়। বিশ্বে যতগুলো শরণার্থী সমস্যা আছে তার কোনোটিই জাতিসংঘ সমাধান করতে পারেনি। অন্যদিকে, বিদ্যমান রোহিঙ্গা সংকটকে পুঁজি করে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এ অঞ্চলে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়। কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরের মতো জায়গায় স্থানান্তর করলে তাদের রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে এই স্বার্থ উদ্ধারের রাজনীতি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের স্থায়ী সমাধানের পথও খোলার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের রাজনীতি না থাকলে এ সংকটকে চীন আর এড়িয়ে না গিয়ে দ্রুত সমাধানে মনোযোগী হবে- এমনটাই বিশ্নেষণে দেখা যাচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতি বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান। যতদিন তা হচ্ছে না, ততদিন কক্সবাজারের ওপর থেকে চাপ কমানোরও বিকল্প নেই। এ কারণে এখন রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ। ভাসানচরে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটাও প্রশংসার দাবি রাখে। জাতিসংঘ যে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরে বিরোধিতা করছে, তার কারণ স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে জাতিসংঘের আপত্তি থাকারও কথা নয়। সম্ভবত, জাতিসংঘকে বিষয়টি নিয়ে আরও ভালোভাবে বোঝালে এ বিষয়ে দ্বিমত দূর হবে। একই সঙ্গে এটাও সত্য, গত তিন বছরে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর যে ধরনের চাপ প্রয়োগ করা দরকার, তা করতে পারেনি। এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি ত্বরান্বিত করার কথাই তাদের ভাবা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে যখন রোহিঙ্গারা দলে-দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখন তো জাতিসংঘ বলে দেয়নি রোহিঙ্গাদের কোথায় রাখতে হবে। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনারও প্রয়োজন হয়নি। বাংলাদেশ নিজের সিদ্ধান্তেই রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারে রেখেছে। এখন সময় ও বাস্তবতা বিবেচনায় তাদের ভাসানচরে স্থানান্তর যুক্তিযুক্ত মনে করছে। যাদের আশ্রয় দিয়েছে তাদের কোথায় রাখা হবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সার্বভৌম ক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাটাই অপ্রয়োজনীয়। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগতভাবে ভাসানচর পরিদর্শন করে দেখতে পেয়েছেন রোহিঙ্গাদের জন্য যে চমৎকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা অন্যান্য চরাঞ্চলে স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে ধরনের পরিবেশে শরণার্থীদের রাখা হয় তার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত পরিবেশ আছে ভাসানচরে। সম্ভবত বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য এত সুন্দর পরিবেশ দুনিয়ার আর কোথাও নেই। জাতিসংঘের উচিত সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজা। ভাসানচর পছন্দ না হলে তারা পৃথিবীর অন্য কোনো উন্নত দেশেও তাদের স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য :জাতিসংঘের বিবৃতির জবাবে গতকাল কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর নিয়ে জাতিসংঘের আপত্তি অযৌক্তিক। বরং তাদের কাছে প্রশ্ন রাখা উচিত, গত তিন বছরে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে? কতজন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে পেরেছে? তিনি বলেন, এত বড় বড় দেশ, এত বিপুল ক্ষমতা যাদের, তারা কেন রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নিচ্ছে না? বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য যেভাবে মানবিক দায়িত্ব নিয়েছে, তার উদাহরণ বিশ্বের আর একটিও নেই। ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে কথা না বলে জাতিসংঘের বরং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাখাইনে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির দিকে নজর দেওয়া উচিত। সুত্র: সমকাল

পাঠকের মতামত

রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে জড়িত: সেনাপ্রধান

রোহিঙ্গারা পরিবেশ ধ্বংস, মাদক চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপকর্মে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ...

‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বারোটা বাজিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে শুধু দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কারণেই আগের সরকার প্রত্যাবাসন উদ্যোগকে ব্যর্থ করে ...

সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াটাও কঠিন হয়ে যাবে একদিন: বিদ্যুৎমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বাংলাদেশ এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ...
Single Page Footer