
কক্সবাজারের মহেশখালীতে গত ২১ জুলাই ঘটে দুর্ঘটনা। আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)। এতে করে দৈনিক ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। পেরিয়ে গেছে দুই সপ্তাহ। কিন্তু মেরামত শেষ হওয়ার নেই নিশ্চিত খবর। চালুর তারিখ পিছিয়েছে তিনবার। সর্বশেষ আশ্বাস ছিল, আংশিক মেরামত শেষে গত শনিবার থেকে গ্যাস সরবরাহে উন্নতির। এখন তা পিছিয়ে সম্ভাব্য সময় আগামীকাল বুধবার (৫ আগস্ট) নির্ধারণ করা হলেও পুরোপুরি নিশ্চিত নয় সেটাও।
এফএসআরইউ মেরামতে এই দীর্ঘসূত্রতা ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ, জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে, এটি কি শুধুই কারিগরি গোলযোগ? নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো ভূরাজনৈতিক সমীকরণ?
এমনকি খোদ জ্বালানি বিভাগের কোনো কোনো কর্মকর্তার মনেও ভর করেছে এমন আশঙ্কা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও তা একেবারে উড়িয়ে দেননি। যদিও এই ধারণার পক্ষে এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ, নথি বা কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে গ্যাস সংকটে স্থবির দেশের অর্থনীতি। বেশিরভাগ শিল্পকারখানার উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে। বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস নামায় লোডশেডিং এরই মধ্যে ছাড়িয়েছে ৩ হাজার মেগাওয়াট। বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশন, সারকারখানা— সব জায়গায় গ্যাসের জন্য হাহাকার।
সরকারও বিষয়টি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতির উন্নতির। গ্যাস সংকটে দুর্ভোগের প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে একাধিকবার সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি ফোন করে চেয়েছেন তার সহায়তা।
জ্বালানি বিভাগ এবং পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, অন্যদের মতো তারাও গ্যাস সংকট নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। সাধারণ মানুষকে স্পষ্ট জবাব দেওয়ার মতো তথ্য নেই তাদের কাছেও। মানুষ জানতে চাইছে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু জবাব দিতে পারছেন না তারা। কারণ, টার্মিনালটির মেরামত কাজ কবে শেষ হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলছে না এক্সিলারেট এনার্জি। টার্মিনাল মেরামতের কাজ করছেন বিদেশি প্রকৌশলীরা। সেখানে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধিই রাখা হয়নি বলে জানা গেছে।
গত শনিবার রাতে এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে জ্বালানি বিভাগের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। তাতে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, বৈঠকে সরকারের তরফ থেকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটিকে নানাভাবে চাপ দেওয়া হয় দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ খন্দকার সালেক সুফি এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির যে ধরন আমরা জানতে পেরেছি, তাতে টার্মিনালটি মেরামতে সাধারণত এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগার কথা নয়। যদিও উত্তাল সাগরের মধ্যে এ ধরনের কাজ কিছুটা জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু এক্সিলারেটরের মতো একটি অভিজ্ঞ কোম্পানির কাছে খুব বেশি কঠিন কিছু নয়। এখানে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। তবে চলতি সপ্তাহে টার্মিনালটি চালু না হলেও আশঙ্কাটা প্রবল হবে।’
‘পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন দুরবস্থার কথা চিন্তাও করা যায় না। এ ধরনের অপারেশনের ক্ষেত্রে এ, বি, সি— এমন নানা ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা থাকে। এক্সিলারেটরের ক্ষেত্রেও নিশ্চয় আছে। এখানে উদ্বেগের জায়গা হলো, এক্সিলারেট বাংলাদেশের কাছে দায়বদ্ধ থাকলেও তারা মেরামত কাজ কবে শেষ হবে, তা নিয়ে পরিষ্কার কিছু বলছে না। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত তাদের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব টিম পাঠিয়ে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা’— যোগ করেন এই অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
সালেক সুফি তাগাদা দিলেন পূর্ব সতর্কতামূলক কিছু পদক্ষেপ নেওয়ারও। ‘আজকে এক্সিলারেটরের টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কালকে যে সামিটের ক্ষেত্রে এমন হবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সুতরাং এখনই বিষয়টি সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত এবং বিকল্প উপায় চিন্তা করতে হবে।’
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানির বড় প্রভাব দীর্ঘদিনের। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় ৫৫ শতাংশই আসে মার্কিন কোম্পানি শেভরনের তিনটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে। এ ছাড়া দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি স্থাপন ও পরিচালনা করছে আরেক মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। সামিট পরিচালিত অন্য টার্মিনালের নির্মাণকাজও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি কিনে তা বাংলাদেশে সরবরাহ করছে তারা।
গ্যাস সংকট সমাধানের জন্য সরকার বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের যে দরপত্র আহ্বান করেছে, সেখানে অংশ নিতে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি। আবার দ্রুততর সময়ের মধ্যে আরেকটি এলএনজি টার্মিনালের যে উদ্যোগ, তাতেও তাদের আগ্রহ রয়েছে। এসব কাজে আগ্রহ রয়েছে চীনসহ অন্যান্য বিদেশি কোম্পানিরও।
অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেকটা গোপনে যে চুক্তি করা হয়, তাতে ১৫ বছরে ১৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের জ্বালানি পণ্য বিশেষ করে এলএনজি কেনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি থেকে এলপিজি কেনারও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ।
এক্সিলারেটরের এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার মধ্যেই মাত্র এক সপ্তাহের নোটিসে সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। তিন দিনের এই সফরকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া বাণিজ্যিক সমঝোতাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের অবস্থান তুলে ধরাই ছিল এই সফরের মূল উদ্দেশ্য।
মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশের তেল-গ্যাস খাতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বেশ পুরনো। ১৯৯০-এর দশকে স্কিমিটার, অক্সিডেন্টাল ও ইউনোকলের মতো কোম্পানি ভারতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস রপ্তানির চেষ্টা করেছিল, এমনকি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এ বিষয়ে লবিং করতে বাংলাদেশ সফর করেন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে ভূরাজনৈতিক চাপের যে আশঙ্কা, তা একেবারে উড়িয়ে দেব না। আবার এটা যে সত্যি, তা-ও বলা মুশকিল। তবে শতভাগ সত্যি হলো বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না কখনোই। বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে অনেক বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও এই একটি বিষয়ে একমত ছিলেন। সেজন্য জ্বালানি নিরাপত্তায় তারা কাজ করেছেন। খালেদা জিয়াও নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাদের কাছ থেকে সেই শিক্ষা কেউ নেয়নি। সেজন্য আমাদের কপালে দুর্ভোগ নেমে এসেছে।’
সংকট কাটাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, ‘পুরনো গ্যাসকূপ খনন এবং এর আশপাশে অনুসন্ধানে বেশি নজর দিতে হবে। অনুসন্ধান করতে অর্থ লাগে না, লাগে সরকারের পলিসি। বিদেশিরা এখানে বিনিয়োগ করার জন্য প্রস্তুত আছে। কিন্তু এলএনজি আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সেই গ্যাসের দামও আকাশচুম্বী। এর পরও কখনো যুদ্ধ লাগবে, কখনো বৈরী আবহাওয়া। আবার কখনো কারিগরি ত্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহে এমন বিঘ্ন ঘটবেই।’
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্র বলছে, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে এক্সিলারেট এনার্জি। এর আগে একটি বয়লার চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাতে দৈনিক ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে। এতে সংকট কিছুটা কমবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান গত রবিবার আগামীর সময়কে বলেছিলেন, ‘গ্যাস সংকটে মানুষের দুর্ভোগের কারণে আমাদেরও খারাপ লাগছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব এলএনজি টার্মিনালটি পূর্ণসক্ষমতায় চালু করার। কিন্তু কাজটা খুবই জটিল এবং স্পর্শকাতর। সে কারণেই সময় লাগছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত দুটি বয়লারের মধ্যে একটি এ সপ্তাহের মধ্যে চালু হতে পারে এমন আশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মেরামত কাজ প্রায় শেষ। এখন চূড়ান্ত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দ্বিতীয় বয়লারটিও কাছাকাছি সময়ে চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
‘সরকারের তরফ থেকে আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। দ্রুত মেরামত কাজ শেষ করার জন্য ৪-৫টি দেশ থেকে বিমানে করে খুব অল্প সময়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি এবং তা খালাস করা হয়েছে ত্বরিত গতিতে। এখন যন্ত্রপাতি নিয়ে আর কোনো সমস্যা নেই। প্রকৌশলীরা দিন-রাত কাজ করছেন টার্মিনাল মেরামতে’— যোগ করেন আব্দুল মান্নান। সুত্র,আগামীর সময়

পাঠকের মতামত