
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে কক্সবাজারের ঈদগাঁওর জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান রাশেদের বিরুদ্ধে তদন্তে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোমবার (১৪ মার্চ) দুপুরে জালালাবাদে চেয়ারম্যানের বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে অনিয়মস্থল এবং অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেছে দুদক টিম।
দুদক কক্সবাজার জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-সহকারি পরিচালক রিয়াজ উদ্দিনের নেতৃত্বে দুদক টিম লোকাল গভর্ন্যান্স সাপোর্ট প্রজেক্ট (এলজিএসপি)’র প্রকল্প, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহারের ঘর আপন ভাইকে বরাদ্দ, এলজিইডি সড়কের গাছ কেটে সাবাড় করা, নিজের ঘরের চালে জনস্বার্থের সোলার প্যানেলের সাহায্যে পানি পিওরিফাই প্রকল্প বসানোসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেন।
জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-সহকারি পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, জালালাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান রাশেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের লিখিত অভিযোগ কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে যায়। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় পরিষদে অভিযান চালানো হয়। পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ উঠা প্রকল্প এলাকাগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। অনিয়মের সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য-প্রমাণ হাতে পেয়েছি। এসব কমিশনে পাঠানো হবে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যান রাশেদ নিজের বাড়িতে যাতায়াতের পথ তৈরীতে এলজিএসপি-৩ এর ৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে জনস্বার্থে দেয়া প্রায় ৮ লাখ টাকা মূল্যের সরকারি সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে চেয়ারম্যানের বাড়ির ছাদে। বীরঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহারের ঘর চেয়ারম্যান তার ভাইকে বরাদ্দ দিয়েছেন। এছাড়াও এলজিইডি সড়ক প্রকল্পে পরিষদের পরিচর্যাধীন ৩৫০টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রাতের আঁধারে বিনা অনুমতিতে কেটে বিক্রি করেছেন চেয়ারম্যান। যার স্পষ্ট প্রমাণপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে অভিযোগে।
কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহি প্রকৌশলী ঋত্বিক চৌধুরী বলেন, জনস্বার্থে ব্যবহারের জন্য এমপিদের মাধ্যমে সোলার প্যানেলের সাহায্যে পানি পিওরিফাইয়ের বেশকিছু প্রকল্প দেয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্তরা এটি ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করে থাকলে তা অনিয়মই।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জেলা পরিষদ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থা কর্তৃক করা প্রকল্প তথ্য গোপন করে সুকৌশলে ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে কতিপয় এমইউপি ও দূর্নীতিবাজ সচিবের সহযোগিতায় অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। ভিজিএফ চাউল-গম জনপ্রতি ১২-১০কেজি করে দেয়ার কথা থাকলেও চেয়ারম্যান দিয়েছেন ৫-৬ কেজি।
কোভিট-১৯ মহামারিতে ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতায় চার দপে বরাদ্দ ১২ টন ৫২০ কেজি চাউল এক হাজার ২৫২ জনের জন্য ১০ কেজি করে দেয়ার কথা থাকলেও সেখানেও অনিয়ম করা হয়েছে। ইউপির নতুন ভবন বুঝিয়ে দেয়ার পরও দু’বছর মাসিক ভাড়ায় ঝুপড়ি ঘরে পরিষদের কার্যক্রম চালান।
এছাড়াও, টিআর-কাবিখা প্রকল্পের কাজ না করে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ, কর্মসৃজন প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়ম, জেলে ভাতা মনগড়া তালিকা, প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার চেয়ারম্যান পরিবারে বিতরণ, পরিষদের মূল আয় ওয়ারিশ সনদের বিপরীতে পাওয়া ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকা ও ভ‚মিহীন সনদের ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রত্যায়ন ও সনদে আয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিষদের আয় ফান্ডে জমা না করে নিজে আত্মসাত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ব্যাপক অনিয়ম, ইউপির দু’সদস্য ও ইউপি সচিবের সহায়তায় ১২টি প্রকল্প (প্রায় ২৪ লাখ টাকা) কাজ না করে টাকা উত্তোলনের পর আত্মসাৎ করেন। তাছাড়া জেলা পরিষদ ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক করা প্রকল্পকে ইউনিয়ন পরিষদের প্রকল্প দেখিয়ে (১০টির মত) প্রকল্পের প্রায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যানের এসব কান্ড ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯ এর ধারা ৩৪(৪) (ঘ) অনুাযায়ী অসদাচারণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার।
এদিকে, ঈদগাঁও কেন্দ্রিয় কালিবাড়ির সামনের খালিজায়গায় অবৈধ বাজার বসিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। ফলে, হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজারিদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি মন্দিরের নিরাপত্তাও বিঘ্নি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা।
পরিষদ সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেন, পরিষদের ২০১৬ হতে ২০২১ সময়ের আয়-ব্যায় হিসাব দেখলে দূর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলবে। ছাত্রলীগ নেতা থাকাকালে দৃশ্যমান কিছু না থাকলেও চেয়ারম্যান হবার পর ইমরুল রাশেদ এখন কোটিপতি। গড়েছেন ৬০ লাখ টাকা দামের আলিশান বাড়ী, ২০ লাখ টাকা দামের প্রাইভেট কার, ১৮ লাখ টাকা দামের নোহা, কোটি টাকা মুল্যের সেইফ ইসলামিয়া মার্কেটের ৯টি দোকান, ৪০ লাখ টাকায় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে ফ্ল্যাট বুকিং, ঢাকা ব্যাংকে ৫০ লাখ টাকার এফডিআরসহ বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে একাউন্ট রয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার চেয়ারম্যান ইমরুল হাসান রাশেদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ফোন না রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পাঠকের মতামত