
খালি পায়ে, গায়ে সবুজ পোষাক। চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ, মুখে লাজুক এক হাসি। আট বছরের ছোট্ট আফিফা জান্নাত রিফা যেন বুকভরা কষ্ট আর এক চিলতে আশা নিয়েই ঢুকেছিল উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তারের কার্যালয়ে। তার চাওয়া ছিল খুবই সামান্য—একটি স্কুল ড্রেস, চোখের চিকিৎসা আর অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে বাঁচার সুযোগ।
সময়টা ২০ জুলাই ২০২৬। বিকেল সাড়ে ৩টা। প্রতিদিনের মতো দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন ইউএনও পান্না আক্তার। ঠিক তখনই কার্যালয়ের দরজায় এসে দাঁড়ায় খালি পায়ের ছোট্ট মেয়েটি। শিশুটির অসহায় মুখ দেখে নিজের আসন ছেড়ে এগিয়ে যান তিনি। কাছে ডেকে কোলে তুলে নেন। স্নেহভরে জানতে চান তার পরিচয়, কেন এসেছে। সেখান থেকেই সামনে আসে এক পরিবারের দীর্ঘদিনের অন্ধকারে ডুবে থাকা জীবনের গল্প।
আফিফা জানায়, তার বাবা, চাচা ও দাদা সবাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সেও ছোটবেলায় দেখতে পেলেও অর্থাভাবে চিকিৎসা না হওয়ায় ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়লেও নতুন স্কুল ড্রেসের অভাবে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।
শিশুটির কথা শুনেই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন ইউএনও পান্না আক্তার।তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যভান্ডারে পরিবারটির তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের পশ্চিম রত্নার খালপাড়া এলাকার ওই পরিবারে ছয়জন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। তারা হলেন—জামাল উদ্দিন (৫৫), ছমুদা বেগম (৯০), আরমান (২৫), জিহাদ (২৩), মাইমুন হাসান (১৯) এবং আফিফা জান্নাত রিফা (৮)। এর আগে একই পরিবারের আরও দুই সদস্য—জেসমিন আক্তার ও ইব্রাহিম মারা গেছেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, কেউ জন্মগতভাবে, আবার কেউ ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। একই পরিবারের একাধিক প্রজন্মে এ সমস্যা দেখা দেওয়ায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে রোগের কারণ নির্ণয়ের দাবি তাদের।
ইউএনওর নির্দেশে পরিবারের সদস্য আরমান ও জিহাদকে কার্যালয়ে আনা হয়। আরমান বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভাতা দিয়ে মাসের পুরো সময় চলে না। অভাবের কারণে আফিফার স্কুল ড্রেস নেই, বাড়িতে স্যানিটারি টয়লেটও নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বহুবার গেলেও কার্যকর কোনো সহায়তা মেলেনি। গত রমজানে অনেক দিন শুধু পানি দিয়েই ইফতার করতে হয়েছে।
পরিবারটির দুর্দশার কথা শুনে কোনো দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নেননি ইউএনও পান্না আক্তার। তিনি আফিফার হাতে নতুন জামা ও স্কুল ড্রেস কেনার জন্য নগদ পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেন। পাশাপাশি পরিবারের জন্য শুকনো খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবস্থা করেন। দ্রুত একটি স্যানিটারি টয়লেট নির্মাণ এবং পরিবারটির প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ। বিদায়ের আগে ইউএনওর হাত শক্ত করে ধরে ছোট্ট আফিফা মৃদু হেসে বলে, "আপা, আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলব?" শিশুটির সেই সরল আবদারে হাসিমুখে সাড়া দেন পান্না আক্তার। মুহূর্তটি যেন দিনের সব আনুষ্ঠানিকতাকে ছাপিয়ে হয়ে ওঠে সবচেয়ে মানবিক দৃশ্য।
উখিয়া উপজেলা প্রতিবন্ধী নেতা রফিক উদ্দিন ফকির বলেন, "একই পরিবারের এতজন সদস্যের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়া অত্যন্ত বিরল ও মর্মান্তিক। তাদের জন্য উন্নত চিকিৎসা, বিশেষ সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জরুরি।"
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রোজিনা আক্তার সুমী বলেন, "পরিবারটি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত ভাতা ও অন্যান্য সহায়তা পাচ্ছে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত কোনো সহযোগিতার সুযোগ এলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।"
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, "পরিবারটির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের নজরে আনা হবে। তার সাথে আলোচনা করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে তাদের উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
পরিবারটির সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং সম্ভাব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এনে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া।
খালি পায়ে ইউএনওর কার্যালয়ে এসেছিল ছোট্ট আফিফা। ফিরে গেছে কিছু প্রয়োজনীয় সহায়তা, চিকিৎসার আশ্বাস আর নতুন এক বিশ্বাস নিয়ে। এখন তার পরিবারের অপেক্ষা—বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, পুনর্বাসন আর এমন একটি দিনের, যেদিন দীর্ঘদিনের অন্ধকার পেরিয়ে তারা স্বাভাবিক জীবনের আলোয় ফিরতে পারবে।