কক্সবাজার টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি নুরুল হুদাকে সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫ কোটি ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ৫৩৭ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকার সম্পদ অর্জন ও ভোগদখল এবং সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রোববার (১৬ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মিজানুর রহমান রায় দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পিপি মোকাররম হোসাইন কালবেলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রায়ের দিন আসামি আদালতে উপস্থিত হয়ে সময়ের আবেদন করেন। আদালত আবেদনটি নামঞ্জুর করে রায় ঘোষণা করেন।
নুরুল হুদা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার দক্ষিণ হ্নীলার লেদা পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা। তিনি হ্নীলা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ছিলেন।
মামলাটিতে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে রোববার রায় ঘোষণা করা হয়।
স্বামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, স্ত্রীর ১০ দিনের কারাদণ্ড
মামলার নথি অনুযায়ী, নুরুল হুদাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পেয়ে দুদক অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে তার নিজ নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়ার পর সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য তাকে আদেশ দেওয়া হয়।
দুদক ২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল নুরুল হুদার নামে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেয়। পরে ৯ মে নিরপেক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তিনি সম্পদ বিবরণী ফরম গ্রহণ করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য তিনি ১৬ মে সময় বাড়ানোর আবেদন করেন। পরে তাকে আরও সাত কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়। এরপরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি সম্পদ বিবরণী দাখিল করেননি বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে নুরুল হুদার নামে মোট ২ কোটি ৯০ লাখ ৩৫ হাজার ৩৩৭ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৬৬ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৩ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ২৩ লাখ ৯৩ হাজার ৪ টাকা। এসব সম্পদের বিপরীতে তাঁর বৈধ বা জ্ঞাত আয়ের উৎস পাওয়া যায় ১৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। ফলে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকা।
অনুসন্ধান নথিতে বলা হয়, টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নুরুল হুদার নামে একাধিক স্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া যায়। এসব সম্পদের মধ্যে বিভিন্ন জমি কেনার পাশাপাশি একটি দুইতলা বাড়ি নির্মাণে আনুমানিক ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। এসব সম্পদের মূল্যসহ স্থাবর সম্পদের মোট হিসাব ২ কোটি ৬৬ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৩ টাকা নির্ধারণ করে দুদক।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ গ্রহণের পরও নির্ধারিত সময়ে বিবরণী জমা না দেওয়ায় দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় এবং জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকার সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলে রাখায় একই আইনের ২৭(১) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
পরে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে তার বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়। মামলার বিচার শেষে ২০২৫ সালের ২২ জুন নুরুল হুদার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত। অভিযোগে বলা হয়, তিনি নির্ধারিত সময়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করে এবং ২ কোটি ৭১ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রেখে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর নুরুল হুদা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বিচার প্রার্থনা করেন।
জানা গেছে, নুরুল হুদার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অপহরণসহ ২৮টি মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক পাচারকারী ছিলেন বলে জানা গেছে।
টেকনাফে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণকারী ১০২ জন মাদক পাচারকারীর মধ্যে নুরুল হুদাও ছিলেন। তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় ১৬টি মাদক, একটি অপহরণ, তিনটি অস্ত্র, একটি বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার চারটিসহ মোট ২৮টি মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।