বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জনসংখ্যা বাড়লেও অর্থায়ন কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এতে ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৮ লাখ থাকাকালে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বরাদ্দ ছিল। ২০২৫ সালে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখে পৌঁছালেও এ বরাদ্দ কমে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলারে নেমে আসে।
অর্থাৎ, এ সময়ে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বাড়লেও স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন কমেছে ৩৯ শতাংশ।
সংকুচিত হয়ে আসছে স্বাস্থ্যসেবা
আরআরআরসি কার্যালয়ের স্বাস্থ্য ইউনিটের তথ্যমতে, বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরে ১১৮টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও ৪০টি পুষ্টিকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি সংস্থার পরিচালনায় সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া ছয়টি ফিল্ড হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া ১৭টি সংস্থার পরিচালনায় ৪৬টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ৪০টি সংস্থার পরিচালনায় ৫৯টি হেলথ পোস্ট এবং তিনটি ডায়রিয়া চিকিৎসাকেন্দ্র চালু রয়েছে।
২০২১ সালে রোহিঙ্গা শিবিরে ১৬৮টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও ৫৯টি পুষ্টিকেন্দ্র ছিল। অর্থাৎ, চার বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্যসেবার পরিসর কমেছে। শুধু ২০২৪ সালের পর থেকে তহবিল সংকটে ১৬টি হেলথ পোস্ট ও ছয়টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি মাসে আরও তিনটি হেলথ পোস্ট বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমানে শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে ৩৯৫ জন চিকিৎসক, ৩৮০ জন নার্স, ২২১ জন প্যারামেডিক এবং ২৯২ জন মিডওয়াইফ।
২০২১ সালে ক্যাম্পে ৫ হাজার ২০০-এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী ছিলেন। তাদের মধ্যে ৪৮০ জন চিকিৎসক, ৪৮৮ জন নার্স, ৫০২ জন প্যারামেডিক এবং ৫৬৭ জন মিডওয়াইফ ছিলেন। অর্থাৎ, চার বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ৩২ শতাংশ কমেছে।
প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩৮ হাজার রোহিঙ্গার বসবাস, সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি
২০১৭ সালে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে পালিয়ে আসেন। জেলার উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর পাহাড়ি ও সংরক্ষিত বন উজাড় করে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ।
নতুন করে রোহিঙ্গাদের আগমন ও শিশু জন্মের কারণে নয় বছরের ব্যবধানে জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১২ লাখে পৌঁছালেও বসবাসের জমির পরিমাণ আগের মতোই রয়েছে। বর্তমানে দুই উপজেলার ৩৩টি শরণার্থী ক্যাম্পে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এর বাইরে প্রায় ২৮ হাজার রোহিঙ্গা নোয়াখালীর ভাসানচরে রয়েছেন। এ হিসাবে ক্যাম্প এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৩৮ হাজার মানুষের বসবাস।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবিরগুলোতে সবসময় সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে। কেউ আক্রান্ত হলে দ্রুত তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ডেঙ্গু, হাম, রুবেলা, কলেরা ও পোলিওর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি নিয়মিতই থাকে। এ কারণে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সবসময় নজরদারি ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদার রাখা প্রয়োজন। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার পরিসর সংকুচিত হলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
আরআরআরসি কার্যালয়ের স্বাস্থ্য ইউনিটের তথ্যমতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জীবনঘাতী ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় ওরাল পোলিও ভ্যাকসিনের (ওপিভি) অষ্টম রাউন্ড এবং কলেরার টিকার নবম রাউন্ড চলছে। এছাড়া ডিপথেরিয়া, হাম ও রুবেলা এবং জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকা দেওয়া হচ্ছে। দেশের জাতীয় রুটিন টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যাম্পগুলোতেও নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
টিকাদানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে শূন্য থেকে ২৪ মাস বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের আওতা ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় তা ২০১৯ সালে ৩২ শতাংশ, ২০২০ সালে ৩৮ শতাংশ, ২০২১ সালে ৪০ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়। ২০২৩ সালে এ হার বেড়ে ৬৪ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৭১ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে রেকর্ড ৮২ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ, সাত বছরের ব্যবধানে টিকাদানের হার ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮২ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে এ হার ৯০ শতাংশ।
তবে ২০২১ সালে শরণার্থী ক্যাম্পে টিকাদানের জন্য ১৯৫টি ইপিআই সেন্টার থাকলেও বর্তমানে তা কমে ১১৪টিতে দাঁড়িয়েছে।
১,১৬৩ জন এইচআইভি পজিটিভ, হেপাটাইটিস সি শনাক্ত প্রায় এক লাখ
নথিপত্রের তথ্যমতে, কক্সবাজারে বর্তমানে ১ হাজার ১৬৩ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৯৮ জনই রোহিঙ্গা।
কক্সবাজারে আরেক নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ জন স্থানীয় বাংলাদেশি, বাকিরা রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার রোগী অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা পেয়েছেন। এ রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল—জনপ্রতি প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। ফলে অর্থের অভাবে অর্ধলক্ষাধিক রোগী চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন বলে আরআরআরসি কার্যালয়ের তথ্য বলছে।
গত মে মাসে প্রকাশিত আইসিডিডিআর,বির গবেষণা অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসের হার ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এর মধ্যে হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ রোহিঙ্গা। উখিয়া ও টেকনাফে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যে হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের হার ২ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জাতীয় গড় প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের দ্বিগুণেরও বেশি।
আরআরআরসি কার্যালয়ের সহকারী হেলথ কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. সারওয়ার জাহান টিবিএসকে বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারে অনিরাপদ সিরিঞ্জ পুনর্ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর প্রথাগত চিকিৎসাপদ্ধতি, অনিরাপদ প্রসব ব্যবস্থাপনা এবং রক্ত পরিশোধন না করে রক্ত সঞ্চালন। বাংলাদেশিরাও আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসা না হলে হেপাটাইটিস সি থেকে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসার হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, "এসব ঝুঁকির কারণে চিকিৎসা ও নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। শরণার্থী ব্যবস্থাপনার স্বাস্থ্য খাতে তহবিল কমলে পুরো জনস্বাস্থ্য খাত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে যাচ্ছে, অনানুষ্ঠানিক শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। হোস্ট কমিউনিটি এবং সারাদেশ থেকে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।"
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেন।
তহবিল সংকটে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাত একীভূত হচ্ছে
বর্তমানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় শিশু ও মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ৪০টি ইনফ্যান্ট অ্যান্ড ইয়ং চাইল্ড ফিডিং (আইএনএফ) সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) আওতায় অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের উচ্চ শক্তিসম্পন্ন বিস্কুটের মতো পুষ্টিকর খাবার বিতরণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তহবিল সংকটের কারণে কক্সবাজারের শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাত একীভূত করা হচ্ছে। এতে সেবার মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কক্সবাজারের শরণার্থী জনগোষ্ঠীর ৭২ শতাংশ নারী ও শিশুকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
স্ট্যান্ডার্ডাইজড এক্সপ্যান্ডেড নিউট্রিশন সার্ভের তথ্যমতে, শরণার্থী শিবিরে ২০১৮ সালে মারাত্মক তীব্র অপুষ্টির (Severe Acute Malnutrition-SAM) হার ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং মাঝারি তীব্র অপুষ্টির (Moderate Acute Malnutrition-MAM) হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ হার কিছুটা কমে যথাক্রমে ৫ দশমিক ১ শতাংশ ও ১৫ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়ায়।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "স্বাস্থ্য খাতে তহবিল কমলে জনস্বাস্থ্য খাতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। স্বাস্থ্যসেবার পরিসর কমানো মানে ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত গণহত্যার শিকার একটি জাতিকে নির্মূলের দিকে নিয়ে যাওয়া। ক্যাম্পে হেপাটাইটিস সির হার অনেক বেশি। ঠিকভাবে মোকাবিলা করা না গেলে এগুলো ডরমেন্ট অ্যাটম বোমা হয়ে উঠবে। সূত্র টিবিএস
