
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় ওমরাহ পালন শেষে দাম্মামে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও দুজন। শনিবার (৫ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টার দিকে দেশটির আল-কাসিম এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, ফরিদপুর শহরের দক্ষিণ ঝিলটুলি এলাকার মোবারক হোসেন, তার ১৫ বছর বয়সি ছেলে তানজিল আব্দুল্লাহ মাহি ও ১৩ বছর বয়সি মেয়ে মাহিয়া। মাহি ওই দেশের নবম শ্রেণিতে ও মাহিয়া সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করত।
একই সময় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন মোবারক হোসেনের স্ত্রী শিখা আক্তার ও বড় মেয়ে মিথিলা ফারজানা মীম। উচ্চশিক্ষার জন্য চলতি মাসের ২৩ তারিখ মীমের কানাডা যাওয়ার কথা। তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মোবারক ও তার সন্তানদের মৃত্যুর খবর পেয়ে ফরিদপুরে তাদের স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। সন্তান, নাতি-নাতনিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মোবারকের বৃদ্ধা মা আলেয়া বেগম।
রবিবার মোবারক হোসেনের ফরিদপুর শহরের দক্ষিণ ঝিলটুলির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বৃদ্ধা আলেয়া বেগম কোনো কথাই বলতে পারছেন না। মোবাইলে ছেলে, নাতি-নাতনিদের ছবির দিকে চেয়ে আছেন। এ ছাড়া বড় ভাইকে হারিয়ে ভাই-বোনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর শহরের দক্ষিণ ঝিলটুলিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন শেখ মোহাম্মদ আলী। তার পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে। ভাই-বোনদের মধ্যে দ্বিতীয় মোবারক হোসেন।
পরিবার সূত্রে আরও জানা যায়, মোবারক হোসেন দরিদ্রতা ঘুচাতে ২০ বছর আগে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। এরপর তিনি দুই ভাইকে নিয়েছেন সৌদি এবং এক ভাইকে পাঠিয়েছেন দুবাইয়ে। মোবারক হোসেন স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মাম শহরে বসবাস করতেন। সেখানে তার গাড়ি মেরামতের দোকান রয়েছে।
মোবারক হোসেনের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ’৬ মাস আগে বড় ভাই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দেশে এসে কিছু দিন থেকে পুনরায় সৌদি চলে যান। ভাইয়ের বড় মেয়ে মিথিলা ফারজানা মীমের ২৩ আগস্ট উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় যাওয়ার কথা ছিল। এ কারণে স্ত্রী, ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ওমরাহ করতে যান তিনি। ফেরার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে।’
জাহাঙ্গীর হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা চরভদ্রাসনে থাকতাম। একসময় নদীভাঙনে আমাদের বসতভিটা বিলীন হয়ে যায়। ভাই সংসার টেনে ওঠাতে দুই যুগ আগে চলে যান সৌদি। অনেক কষ্ট করে আমাদের ভাই-বোনদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। দুই ভাইকে সৌদি নিয়েছেন, আরেক ভাইকে দুবাই পাঠিয়েছেন। বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। আমাদের বাড়ি করে দিয়েছেন। ভাই শুধু আমাদের দিয়েই গেছেন, আমরা ভাইয়ের জন্য কিছুই করতে পারিনি।’
মোবারক হোসেনের ছোট বোন নাজিয়া আফরোজ রিক্তা বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভাই বললেন আমি ওমরাহ করতে যাচ্ছি আমার জন্য দোয়া করিস। বড় ভাই ছিল আমাদের বটগাছ। সব সময় আমাদের সব আবদার পূরণ করতেন।’
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ভাতিজা-ভাতিজি সেখান থেকে আমাকে ভিডিও পাঠিয়েছে, কী খাচ্ছে, কী করছে। আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।’
মোবারক হোসেনের বাবা শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমার মোবারকের জন্যই আজ আমাদের অবস্থার উন্নতি। কী করলে আমরা একটু ভালো থাকব, সব সময় ওর মাথায় এই চিন্তাই থাকত।’
মোহাম্মদ আলী কথা বলছিলেন আর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। একসময় ছেলের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্না আর থামছিলই না তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ছোট নাতি-নাতনি আমাকে কত ভালোবাসত। কিছু দিন আগেই ওরা এসেছিল। আমাকে কী পড়লে ভালো লাগে, কী খেতে ভালো লাগে সব সময় শুনত। তাদের ভুলব কী করে? এই বৃদ্ধ বয়সে আমি সহ্য করতে পারছি না। বাবা বেঁচে থাকতে ছেলের মৃত্যু কীভাবে মেনে নেব? আমার সব শেষ হয়ে গেল।’
তিনি বলেন, ‘সংবাদ পাওয়ার পর আমার ছেলের শ্যালক সৌদি চলে গেছেন। আমার ছেলে, নাতি-নাতনিদের মরদেহ দেশে আনার কথা বলেছি। ওদের একনজর শেষ দেখা দেখতে চাই। সরকার যেন আমার ছেলে ও নাতিদের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে।’