রহমত উল্লাহ, উখিয়া (কক্সবাজার)
দীর্ঘ ছয় মাস আরাকান আর্মির অমানবিক বন্দিজীবন শেষে ৭৩ জন বাংলাদেশি জেলে দেশে ফিরেছেন গত সোমবার। তাঁদের শারীরিক অবস্থা, নির্যাতনের বর্ণনা আর চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ দেখে স্বজনরা যেমন শিউরে উঠেছেন, তেমনি নতুন করে ভয়ের ছায়া নেমেছে সীমান্তের জেলেপল্লীতে। ফিরিয়ে আনার এক দিনের মধ্যেই আবার পাঁচ জেলেকে ট্রলারসহ তুলে নিয়ে গেছে মায়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। এদিকে আরো দেড় শতাধিক জেলে এখনো ফেরেননি।
তাঁদের পরিবারে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। উপার্জনক্ষম সদস্য না থাকায় অনেক পরিবার খেয়ে-না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।
গত সোমবার টেকনাফের জেটি ঘাটে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ট্রলার থেকে নামেন মুক্তিপ্রাপ্ত জেলেরা। তাঁদের চোখে-মুখে আনন্দের চেয়ে কান্নাই বেশি ছিল।
অপুষ্টি, নির্যাতন আর দীর্ঘদিন ২৪ ঘণ্টা পায়ে শিকল বাঁধা থাকার কারণে তাঁদের চেহারা ও শারীরিক গঠন এতটাই বদলে গেছে যে, অনেককে প্রথমে চেনাই যায়নি। কেউ ঠিকমতো হাঁটতে পারছেন না, কারো পায়ে গভীর সংক্রমণ, কারো কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে আতঙ্কে।
ফেরত আসা জেলেদের ভাষ্য, প্রথমে প্রায় ৪৫ দিন হেফাজতে রাখা হয়। পরে নিজেদের কথিত আদালতে তুলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়।
আরাকান আর্মির বন্দিশালা থেকে ফেরত আসা জেলে জাহাঙ্গীর আলম জানান, সারাক্ষণ পায়ে শিকল বাঁধা থাকত। জোর করে ক্যাম্পের কাজ, ক্ষেতের শ্রম, পাথর টানা—এমন নানা কঠোর পরিশ্রম করানো হয়েছে। সামান্য বিশ্রাম নিলেই লোহার রড দিয়ে মারধর করা হতো।
এক জেলে বলেন, ‘কয়েকজনকে মারা যেতে দেখেছি। গর্ত খুঁড়ে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
’
মুক্তিপ্রাপ্তদের একজন জেলে নুরুল আলম তিনি বলেন, ছেড়ে দেওয়ার আগে শর্ত দেওয়া হয় বাংলাদেশ সরকার যেন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চালুর সুযোগ দেয় এবং আটক সদস্যদের মুক্তি দেয়। এমনকি কোরআন শরিফ ছুঁইয়ে শপথ করানো হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় মাছ শিকার না করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, সংঘাতের জেরে রাখাইন অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে খাদ্য ও অর্থসংকটে পড়ে তারা সীমান্তে সক্রিয়তা বাড়িয়েছে। জেলেদের নৌকা আটক করে মাছ, জাল, জ্বালানি ও সরঞ্জাম লুটের ঘটনাও ঘটছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মাসে নাফ নদে ও বঙ্গোপসাগর এলাকা থেকে ট্রলারসহ অন্তত ২০৫ জেলে আটক হন। এর মধ্যে ৭৩ জনকে ফেরত আনা হয়েছে সীমান্ত পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে।
বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আলোচনার ফলেই জেলেদের ফেরানো সম্ভব হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রেও যোগাযোগ চলছে