
মিয়ানমার সীমান্তে শতভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সীমান্তে বাড়ানো হয়েছে বিজিবির সদস্য সংখ্যা ও নজরদারি। সীমান্তের ওপারে মাইন পুঁতে রাখার আশঙ্কার পাশাপাশি সম্প্রতি মাদক প্রবেশের পরিমাণ বেড়েছে বলেও জানিয়েছে বিজিবি। এসব ঘটনায় আরাকান আর্মির সম্পৃক্ততার আশঙ্কা করছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম।
সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে কক্সবাজারস্থ ৩৪ বিজিবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম জানায়, মিয়ানমার থেকে নয়াপাড়া সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও ইয়াবার চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করবে তথ্য পায় বিজিবি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিজিবির বিশেষ দল রাতে সীমান্ত পিলার-৩১ থেকে ১৩০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নয়াপাড়া এলাকায় কৌশলে অবস্থান নেয়। এসময় বিজিবির অবস্থান টের পাচারকারীরা মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পালালেও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ১টি বিদেশি অস্ত্র, পাঁচ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং ২ লাখ ৪৬ হাজার ইয়াবা।
মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ মাদক প্রবেশের পেছনে আরাকান আর্মির সম্পৃক্ততার আশঙ্কা করছে বিজিবি। সীমান্তের চোরাকারবারিদেরও এ কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে জানিয়েছে ৩৪ বিজিবি।
অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, “আরাকান আর্মি কোনো স্বীকৃত বাহিনী নয়। তারা সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল পরিমাণ মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এই বিপুল পরিমাণ মাদক বাংলাদেশে আসার সঙ্গে আরাকান আর্মির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে ধারণা করছি।”
“আমাদের ধারণা, বাংলাদেশের চোরাকারবারিরাও আরাকান আর্মিকে কোনোভাবে আমলে না নিয়ে এ ধরনের মাদক ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। এ বিষয়ে কারা কারা জড়িত, আমরা তাদের একটি তালিকা প্রণয়নের কাজ করছি। এর আগেও একটি তালিকা ছিল। তবে সম্প্রতি আমরা কিছু নির্দেশনা পেয়েছি। সেই নির্দেশনার আলোকে তালিকাটি আরও বাস্তবসম্মত ও হালনাগাদ করার কাজ চলছে।”
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশি নাগরিকদের অযাচিতভাবে সীমান্তের কাছে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কক্সবাজারস্থ ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই সীমান্তে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। নিজেদের মধ্যে রেষারেষি ও ছোটখাটো যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সীমান্ত এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা হয়ে থাকতে পারে। এর কিছু মাইন বাংলাদেশের সীমান্তেও এসে পড়েছে, যদিও অধিকাংশই মিয়ানমার সীমান্তের ভেতরে রয়েছে।
“আমরা বিজিবি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি, যাতে কেউ অযাচিতভাবে সীমান্তের কাছাকাছি না যায় বা সীমান্ত এলাকায় ঘোরাফেরা না করে। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে-সীমান্তে পুঁতে রাখা মাইনের কারণে যেন কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
“এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সচেতনতা ছাড়া আমাদের পক্ষেও খুব বড় পরিসরে কিছু করা সম্ভব নয়। একজন ব্যক্তি যদি ঝুঁকির বিষয়টি জানার পরও সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করেন, তাহলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই বিজিবি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে জনগণকে সচেতন করতে এবং সবাইকে সীমান্ত এলাকায় অযাচিতভাবে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করতে।”
বিজিবি অধিনায়ক জানান, মিয়ানমার সীমান্তে শতভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সীমান্তে বাড়ানো হয়েছে বিজিবির সদস্য সংখ্যা ও নজরদারি।
অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, “আমাদের সতর্কতা অবশ্যই রয়েছে। আপনারা যদি একটু পর্যালোচনা করেন বা অতীতের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে দেখবেন-যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবির সদস্য সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। অতীতে কখনোই এত বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়নি। সীমান্তের বিওপিগুলোতে আমরা সদস্য সংখ্যা বাড়িয়েছি। তাই আমাদের সতর্কতা নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ নেই। আমরা শতভাগ সতর্ক অবস্থানে আছি।
“সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে যেসব খবর প্রকাশিত হয়, আমরা সেগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। তবে কোনো তথ্য কতটুকু সত্য বা সঠিক, তা যাচাই-বাছাইয়ের বিষয় রয়েছে। অনেক সময় পুরোনো ছবি ব্যবহার করে নতুন ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে খবর প্রচার করা হয়, আবার কেউ কেউ মনগড়া তথ্যও প্রকাশ করেন। তবে আমরা কোনো তথ্যই একেবারে উপেক্ষা করি না। প্রতিটি বিষয় আমলে নিয়ে যাচাই করি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করি।”
এদিকে উখিয়াস্থ ৬৪ বিজিবি জানায়, মিয়ানমার থেকে মাদকের চালান প্রবেশের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার ভোরে টেকনাফের উলুবনিয়া গ্রামের জোড়াকাঠি এলাকায় কৌশলগত অবস্থান নেয় বিজিবি। এসময় মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তি-নুর বশর ও আবুল ফয়েজকে আটক করা হয়। পরে তাদের বহন করা ব্যাগ তল্লাশি করে ৩ লাখ ৫০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি।
©দৈনিক কক্সবাজার