বিজিবি, কোস্টগার্ড ও আইন শৃংখলা বাহিনীর কঠোরতার মাঝেও টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার বড় বড় চালান ঢুকে পড়ছে। সম্প্রতি সময়ে ইয়াবা চোরাচালান ব্যাপকহারে বেড়েছে। এদিকে ইয়াবার চালান নিয়ে আসার পথে বিভিন্ন সময় আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে ইয়াবা পাচারকারীরা আটক হচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের মাদক বিরোধী অভিযানে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত চুনোপুটিরা আটক হলেও প্রকৃত গডফাদাররা ঠিকই অধরা থেকে যাচ্ছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এদিকে ইয়াবার চালান নিয়ে পাচারকারী এবং ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত চুনোপুটিরা হাতে নাতে আটক হয়ে জেল গেলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে তারা জেল থেকে ফেরত আসছেন। এতে করে অল্প সময়ের ব্যবধানে গাড়ি বাড়ির মালিক হওয়ার আশায় পাচারকারী এবং চুনোপুটিরা আবারো ইয়াবা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
স্থানীয় সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিরা সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা পাচার বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ ও নিজেদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। তারা জরুরী ভিত্তিতে কাল বিলম্ব না করে ইয়াবা পাচার ঠেকাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর থেকে আরো কঠোরতা অবলম্বনের দাবী জানিয়েছেন। মাদক বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় লোকজন জানিয়েছেন, সীমান্তে বিজিবি কোস্টগার্ডের পাশাপাশি অন্যান্য আইন শৃংখলা বাহিনীকে মাদক নিয়ন্ত্রণের উপর উন্নত এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, মাদক সংক্রান্ত বিচার তরান্বিত করতে সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আইন ও বিচার বিভাগ গত ৩ সেপ্টেম্বর সারাদেশের জন্য ১৭টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে একটি গেজেট প্রকাশ করেছেন। ৬ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বিচার শাখা-৪। সেখানে কেবল কক্সবাজারের জন্যই ৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত আদালতের নামও ঘোষণা করেছেন। প্রজ্ঞাপনের স্পষ্ট বলা হয়েছে চলমান মামলা সমুহ নবগঠিত মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল সমুহে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মোতাবেক স্থানান্তরিত হইবে। সেই পর্যায় হইতে উক্ত মামলার বিচারকার্য ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত হইবে বলে প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর মাদক পাচারকারী এবং ব্যবসায়ীরা নতুন করে আরো তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। স্থানীয় মাদক বিরোধী সচেতন লোকজনের মতে , ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়টি মাদক সংশ্লিষ্টদের মাঝে তেমন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে এরপর থেকে সীমান্ত পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে আরো বড় বড় ইয়াবার চালান ধরা পড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, প্রজ্ঞাপন প্রকাশের দিন ( ৬সেপ্টেম্বর) মরিচ্যা চেক পয়েন্টে ৫৪হাজার পিচ ইয়াবাসহ মোহাম্মদ আলী মুন্না সিকদার নামের এপিবিএন পুলিশে কর্মরত এক কনষ্টেবল হাতে নাতে আটক হয়েছেন। পরের দিন (৭সেপ্টেম্বর) কক্সবাজার হাজিপাড়া থেকে পুলিশ কর্মকর্তা শহীদের বিলাস বহুল বাসায় অভিযান চালিয়ে ৯০হাজার পিচ ইয়াবা ও বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ তার শ্যালক আশিক মোমিন মেহেদী, আশিকের বউ ও শ্যালকসহ ৩জনকে হাতে নাতে আটকের ঘটনা ঘটে। বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও নগদ টাকাসহ আটক আশিক টেকনাফের হ্নীলা পানখালী এলাকার শামসুল আলম ওরফে লেং শমসুর ছেলে। তার বড় ভাই রেজাউলও পুলিশের কনষ্টেবল পদে চাকুরী করেন। পরপর দুই দিনের পুলিশ ও পুলিশ পরিবারের সদস্যরা ইয়াবার বড় চালান নিয়ে আটক হওয়ার খবরে জনমনে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ৯সেপ্টেম্বর দুপুরে ৬৪বিজিবির আওতাধীন হ্নীলা বিওপির জওয়ানেরা নাটপাড়াস্থ জালিয়াপাড়া সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৪লক্ষ পিচ ইয়াবাসহ দুই ইয়াবা কারবারীকে আটক করেন। এর আগে গত ৩-৪ সেপ্টেম্বর হোয়াব্রাং সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই কারবারীসহ ৩লাখ পিচ ইয়াবা জব্দ করেন। এছাড়া বিজিবি কোস্টগার্ড র্যাব পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর অভিযানে প্রতিনিয়ত ইয়াবার বড় বড় চালান আটক হচ্ছে।
এদিকে উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪বিজিবি) ৯সেপ্টেম্বর বিকেলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০২৬ সনের ১জানুয়ারী থেকে এপর্যন্ত (গতকাল ৯সেপ্টেম্ব পর্যন্ত) ৬৪বিজিবির আওতাধীন বিভিন্ন বিওপিতে কর্মরত বিজিবি জওয়ানেরা অভিযান চালিয়ে সর্বমোট এক কোটি ৪৩লক্ষ পিচ ইয়াবা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। এসময় তাঁরা (৬৪বিজিবির জওয়ানেরা) ২৪৩জন আসামীকে আটক করেছেন।
হ্নীলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বাহাদুর শাহ তপু চরম হতাশা এবং ক্ষোভ নিয়ে জানান,মাদক এভাবে বন্ধ হবেনা! মাদক বন্ধ করতে হলে সবখানে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। এটি এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে মাদক সংশ্লিষ্টদের পৃষ্টপোষকতা বন্ধ করতে হবে। মাদক কারবারীদের রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে বয়কট করলেই এটি নিয়ন্ত্রণ অনেকটা সহজ হবে বলে এই ব্যবসায়ী নেতা মনে করেন।
জানতে চাইলে ৬৪বিজিবির অধিনায়ক লে: কর্ণেল জহিরুল ইসলাম জি বলেন, বিজিবির মাদক বিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও প্রযুক্তিগত এবং জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ব্যাটালিয়নের সীমান্ত এলাকায় শত প্রতিকুলতা এবং সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিজিবি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের মাধ্যমে কার্যক্রম অব্যাহত রাখছে এবং চোরাচালান শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চেষ্ঠা চলছে। তিনি আরো বলেন, মাদক চোরাচালান রোধে বিজিবির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে।