কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড়ঘেরা বিশাল রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এখন আর কেবল মানবিক আশ্রয়ের স্থান নয়; বরং এগুলো পরিণত হয়েছে আন্তঃদেশীয় অপরাধ, সশস্ত্র মহড়া ও নিত্যদিনের খুনোখুনির অন্যতম হটস্পটে। মাদক চোরাচালান, মানব পাচার, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে খুনোখুনিতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় বাংলাদেশিরাও। সুবিশাল এই জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারি ও অপরাধ দমনে বর্তমানে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল নিতান্তই অপ্রতুল। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও অপরাধের লাগাম টানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ‘পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন’ গঠনের জোর দাবি জানিয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। দীর্ঘমেয়াদি এই ব্যাটালিয়ন গঠনের প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায়, অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি ‘অ্যাডহক ব্যাটালিয়ন’ গঠনের বিকল্প প্রস্তাবও বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো এর ক্রমবর্ধনশীল জনমিতি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত দমন-পীড়নের মুখে প্রাণ বাঁচাতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের তথ্যমতে, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখই এসেছিল ২০১৭ সালের আগস্ট-পরবর্তী কয়েক মাসে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এত কড়াকড়ির পরও সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ থামেনি। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে ১ লাখ ২১ হাজার নিবন্ধিত হলেও বাকিরা নিবন্ধন ছাড়াই অবৈধভাবে বসবাস করছে। নতুন আসা এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই নারী ও শিশু।
সব মিলিয়ে বর্তমানে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছে। পাশাপাশি প্রতি বছর ক্যাম্পগুলোতে নতুন করে প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে এই বিপুল সংখ্যক ভিনদেশি নাগরিকের চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজকাঠামো ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশাল এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তায় বর্তমানে এপিবিএনের মাত্র তিনটি ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। গত ১৫ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো এক চিঠিতে এপিবিএন বিস্তারিতভাবে তাদের সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে। চিঠিতে বলা হয়, উখিয়ায় ৮ ও ১৪ এপিবিএন এবং টেকনাফে ১৬ এপিবিএন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ৩৪টি ক্যাম্পে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় জনবল ও অবকাঠামোগত চরম সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এপিবিএন সদস্যরা ২৩টি ক্যাম্পে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন, যা দেশি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে।
তবে ক্যাম্পের পরিধি, অপরাধের ধরন ও নতুন অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা বিবেচনায় বর্তমান জনবল দিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ কারণেই মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও বিতাড়িত নাগরিক তথা এফডিএমএন অধ্যুষিত এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য নতুন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন গঠন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধের আঁচ এখন স্থানীয় জনপদেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি টেকনাফের ৬ নম্বর বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শিলখালির বাসিন্দা আবু দাউদ মোহাম্মদ সরকারের কাছে একটি লিখিত আবেদন করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ৫ নম্বর বাহারছড়া ইউনিয়নের ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ডাকাতি, অপহরণ ও মানব পাচার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তিনি পাহাড়ি পাদদেশে আধুনিক সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত জনবলসহ একটি স্থায়ী যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানান।
এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর এপিবিএনের মতামত জানতে চায়। এপিবিএন তাদের ফিরতি চিঠিতে কৌশলগত দিকটি তুলে ধরে জানায়, ওই ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বিজিবির একটি ক্যাম্প রয়েছে। সেখান থেকে এপিবিএনের ২২ নম্বর উনচিপ্রাং ক্যাম্পের দূরত্ব ৭ কিলোমিটার এবং পুলিশের তদন্ত কেন্দ্র মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যেহেতু ওই এলাকায় সরাসরি কোনো নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প নেই, তাই আলাদা যৌথ ক্যাম্প স্থাপনের বদলে একটি বৃহৎ ও বিশেষায়িত পূর্ণাঙ্গ এপিবিএন ব্যাটালিয়ন স্থাপন করা অধিকতর যৌক্তিক। এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে বিশেষায়িত জনবল বা ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি) নিয়োগ করা সম্ভব হবে, যা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রমতে, উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে বর্তমানে অন্তত ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। কয়েক বছর আগেও ১০টির মতো গ্রুপ সক্রিয় ছিল, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বেশ কয়েকটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু বর্তমানে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের সহযোগীরা কারামুক্ত হয়ে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে।
এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিয়ানমারের আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এবং আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে সংঘাত সবচেয়ে প্রকাশ্য ও ভয়াবহ। ক্যাম্পকেন্দ্রিক বিশাল মাদকের বাজার, চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক ও অপহরণ বাণিজ্য একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই এদের মূল লক্ষ্য। ফলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি উন্নয়নকর্মীরাও চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন।
রক্তপাতের পরিসংখ্যানও বেশ ভীতিকর। জেলা পুলিশের তথ্যমতে, ক্যাম্পগুলোতে সবচেয়ে বেশি মামলা হয় মাদক ও অপহরণের। ২০১৭ সাল থেকে গত ৯ বছরে তিন শতাধিক খুনের ঘটনায় ২৯৫টি মামলা হয়েছে। ২০২৩ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৬৬টি খুনের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ২০২৪ সালে তা কমে ৪৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৫টিতে নেমে আসে। তবে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই নতুন করে ৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
৬ মে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৮ (পশ্চিম) বি-ব্লকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ছোট ভাই মোহাম্মদ কামালকে (৩৫) প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঠিক এর আগের দিন ৫ মে সন্ধ্যায় উখিয়ার নৌকারমাঠ পুলিশ ক্যাম্পের আওতাধীন ক্যাম্প-৭ এলাকায় আরসা নেতা কেফায়েত উল্লাহ হালিমকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় তারা নিয়মিত গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করছেন। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপহৃতদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকলেও, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও উপস্থিতি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশ