মাহাবুবুর রহমান :
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগন। একই সাথে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়ার কাজে যারা সহযোগিতা করেছে তাদেরও শাস্তির দাবী জানান সচেতন মহল। তাদের দাবী মায়ানমার প্রত্যবাসনের দিনক্ষন ঠিক করে প্রত্যাবাসন না হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে তারা এখন সুযোগ নিবে এবং বহির্বিশ্বকে উল্টো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বুঝিয়ে সমালোচনা করবে এবং ভবিষ্যতে রোহিঙ্গারা আর ফিরে না যাওয়ারও যথেষ্ট সম্ভবনা আছে বলে দাবী করেন কক্সবাজারের সচেতন মহল।
উখিয়া উপজেলা সুজন সভাপতি নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার থেকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা আসার পরে মায়ানমার সরকার প্রথমে রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিক নয় বলে দাবী করেছিল, পরে আবার কিছু সীমান্তবর্তি মানুষকে অনধিকার প্রবেশ করানোর জন্য উল্টো বাংলাদেশ কে দোষারোপ করেছিল। পরে বাংলাদেশের সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক হিসাবে স্বীকার করে প্রত্যাবাসনের জন্য রাজি হয়। এর পরে অনেক চুক্তি আর সময় ক্ষেপনের পর ১৫ নভেম্বর কিছু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহন করে। কিন্তু বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে পারেনি এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখ জনক। আমি দেখেছি সেদিন রোহিঙ্গারা যেভাবে স্লোগান দিচ্ছিল এবং আমাদের দেশের অনেক সরকারি কর্মকর্তাদেরও নাজেহাল করছিল এটা কোন ভাবেই কাম্য হতে পারে না। এতে তাদের ভেতরে অপরাধবোধ জন্ম নেবে, এটা আমাদের জন্য খুবই ক্ষতিকারক হবে।
উখিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিুকল ইসলাম বলেন, সীমিত সংখ্যক হলেও যে মায়ানমার সরকার প্রত্যাবাসন শুরু করেছে এটাই আমাদের জন্য ভাল খবর ছিল। পরে যে অবস্থা দেখলাম এটা আমাদের জন্য খুবই লজ্জা জনক। রোহিঙ্গাদের জন্য গাড়ী বহর ছিল, খাবার দাবার ছিল, বিপুল সংখ্যক আইন শৃংখলা বাহিনী ছিল তার পরও কেন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো গেল না ? এরা কি আমাদের দেশের আইন শৃংখলার বাইরে। এছাড়া আরো একটি দেখার বিষয় আছে,রোহিঙ্গাদের হাতে যে সমস্ত প্লেকার্ড ছিল তা ইংরেজীতে লেখা আর তাদের মুখে যে স্লোগান দিচ্ছিল তা অবশ্যই কারো না কারো শিখিয়ে দেওয়া। কারন রোহিঙ্গারা ইংরেজী লিখতে পারেনা, পারলেও প্রত্যাবাসন বিরুধী এত সুন্দর করে লিখতে পারার কথা না। এটা নিশ্চই কোন এনজিওর লোকজন তাদের লিখে দিয়েছে এবং শিখিয়ে দিয়েছে। তাই স্থানীয় জনগন হিসাবে আমরা দাবী করছি আগে সে সমস্ত এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হউক।
টেকনাফ উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি আবুল হোসেন রাজু বলেন,এতদিন আমরা অপেক্ষা করে ছিলাম মায়ানমান কখন প্রত্যবাসনের জন্য রাজি হচ্ছে কিন্তু যখন তারা রাজি হলো আমরা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে পারলাম না। আগে বাংলাদেশ জাতি সংঘ সহ সব আর্ন্তজাতিক সংস্থার কাছে গিয়ে বলতো রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে কিন্তু এখন মায়ানমান সব জায়গায় গলা উচু করে বলবে আমরা ফেরত আনতে রাজি ছিলাম কিন্তু বাংলাদেশ ফেরত দিকে পারে নি। এতে বাংলাদেশের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হতে পারে। একই সাথে রোহিঙ্গাদের যে সমস্ত দাবীর কথা বলে ফেরত যায় নি আদৌ কি সেই সব দাবী কি পূরন করা সম্ভব? এসব দাবী একশত বছরেও পূরন হবে না বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সুতরাং রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়েছে সেটা অনেকটা নিশ্চিত। একই সাথে যে সমস্ত এনজিও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছে তাদের দ্রুত সনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী জানাচ্ছি।
টেকনাফের সাবেক কমিশনার আবদুল কুদ্দুস ও শিক্ষক শাহজাহান বলেন, আমরা ব্যক্তিগতভাবে খুবই ক্ষুব্ধ এবং হতাশ। কারন রোহিঙ্গারা যদি আন্দোলন করে ফেরত যাওয়া বন্ধ করতে পারে তাহলে তাদের ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে নেওয়া খুব কঠিন হবে। আর রোহিঙ্গার কারনে যাদের লাভ হচ্ছে তারাই রোহিঙ্গাদের ফেরত না যেতে উৎসাহিত করছে বলে আমরা খবর পেয়েছি এর ফলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকি তাদের হাতে জিম্মি হয়ে থাকবে নাকি আমরা ভিটামাটি ছেড়ে চলে যাব।
রামু কলেজের অধ্যাপক আবু তাহের বলেন,যখন থেকে শুনেছি রোহিঙ্গা প্রত্যবাসন হচ্ছে তখন থেকে একটি ভাল লাগা কাজ করছিল কিন্তু একটি সংশয়ও মনের মধ্যে ছিল আদৌ প্রত্যাবাসন হবে কিনা কারন রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মায়ানমারে যে নাগরিক সুবিধা পায়নি তার চেয়ে শতগুন সুযোগ সুবিধা বাংলাদেশে পাচ্ছে। তারা এখন ভাত কাপড়ের পাশাপাশি কথা বলা এমনকি আন্দোলন করারও সুযোগ পাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা ফেরত না যাওয়াটা আমার মতে স্থানীয়দের জন্য একটি বড় অশনি সংকেত। আর সে দিন টিভিতে যেভাবে খবরে দেখলাম রোহিঙ্গারা যেভাবে বেপরোয়া ভাবে আন্দোলন করছে এটা কোন ভাবেই আমাদের জন্য মঙ্গল জনক নয়। কারন সুযোগ পেলে তারা অন্যকিছুর জন্য এভাবে আন্দোলন করতে পারে। আর ১২ লাখ রোহিঙ্গা যদি আন্দোলনে নামে তাহলে পরিস্থিতি কি হতে পারে সেটা সহজে অনুমেয়। তাই সময় থাকতে আমাদের সাবধান হতে হবে যে কোন ভাবেই হউক রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে শক্ত উদ্যোগ নিতে হবে।
কক্সবাজার সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর এম এ বারী বলেন,রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনার ভেতরে যখন জাতিসংঘ বিবৃতি দিচ্ছে মায়ানমার এখনো প্রস্তুত না তখনি আমি মনে করেছিলাম প্রত্যাবাসন বোধয় বাধা গ্রস্থ হবে। কারন আর্ন্তজাতিক মহল রোহিঙ্গা ইস্যূ নিয়ে অনেক ধরনের রাজনীতি করছে। তবে কম হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হওয়াটা খুব জরুরী ছিল,কারন একটা প্রক্রিয়া শুরু হলে সেটা ধারাবাহিক থাকতো। এখন পুরু প্রক্রিয়াটাই বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া মায়ানমার একটি বড় সুযোগ পেল আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে কথা বলার জন্য। এতদিন তারা কোন কথা বলতে না পারলেও এখন বলবে আমরা নিতে চাইলেও বাংলাদেশ দিতে পারছে না।এতে আগামী দিনে স্থানীয় জনগনের জন্য ক্ষতির পরিমান আরো বাড়তে পারে।
এদিকে শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ আবুল কালাম বলেন,এখনো সব কিছু শেষ হয়ে যায় নি,তবে রোহিঙ্গারা সেচ্ছায় ফিরতে চাইলেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। তবে সচেতন মহলের দাবী রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় মায়ানমারে ফেরত যাওয়ার সম্ভবনা খুবই কম। সুত্র : দৈনিক কক্সবাজার