রোহিঙ্গাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। মিয়ানমার ও বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের যৌথ উদ্যোগে চলছে এ দেশে ইয়াবার বাজার। ইয়াবা কারবারিদের সাম্প্রতিক কৌশল এটি। সাথে যুক্ত করেছে জঙ্গি সংগঠনগুলোর অনুসরণে ‘কাট আউট’ পদ্ধতি। সম্প্রতি নগর গোয়েন্দা পুলিশ ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অভিনব কায়দায় ইয়াবা পাচারের এ চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. ইলিয়াস খান আজাদীকে জানান, চক্রটি রোহিঙ্গাদের নিয়েই গঠিত। মিয়ানমারে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ সীমান্ত পার করে এ দেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছে দিচ্ছে ইয়াবার চালান। আবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দ্বিতীয় গ্রুপটি চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে এসব ইয়াবার চালান পৌঁছে দিচ্ছে। এক বাংলাদেশি পুরো কার্যক্রমটা মনিটরিং করার পাশাপাশি ইয়াবা ব্যবসায় বিনিয়োগও করেছে। গত শুক্র ও শনিবার ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ৩ রোহিঙ্গা নাগরিককে গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে এসব তথ্য পেয়েছে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের কাছ থেকে ১৫ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলো- কক্সবাজারের কুতপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. নিয়াজ উদ্দিন (২৫), কক্সবাজারের টেকপাড়া এলাকায় বসবাসরত মো. আইয়ূব আলী (৪২) এবং সীতাকুণ্ডের সলিমপুর এলাকায় বসবাসরত মো. সেলিম (৩২)। এরা তিনজনই রোহিঙ্গা নাগরিক। তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও তিন রোহিঙ্গার এই চক্রে জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। তারা হলো- মো. হানিফ (৩৮), কালা মোহাম্মদ (৩৮) ও মো. আলম (৫০)।
অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ডিবির পরিদর্শক ইলিয়াস জানান, শুক্রবার রাতে নগরীর ষোলশহর বিবিরহাট এলাকায় ইয়াবা নিয়ে চারজন ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করছিল। নগর গোয়েন্দা পুলিশের টিম অভিযানে গেলে দু’জন পালিয়ে যায়। নিয়াজ ও আইয়ূবকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে ডিবি। এরপর তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সেলিমকে শনিবার ভোরে সীতাকুণ্ডের উত্তর সলিমপুরের বাংলাবাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার নিয়াজের পরিবার মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল এক দশক আগে। পরে সে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নগরীর হালিশহর এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে।
আইয়ূব আলী পরিবার নিয়ে বছর দুয়েক আগে মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারে আসে। প্রথমে অস্থায়ী ক্যাম্পে ছিল। পরে কক্সবাজার শহরের টেকপাড়ায় পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করে। সেলিম দুই বছর আগে মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারে আসে। দুই বছর আগে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে প্রথমে কিছুদিন অস্থায়ী ক্যাম্পে থাকলেও পরে সীতাকুন্ডের সলিমপুরে এসে পাহাড়ে ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করে।
অন্যদিকে হানিফ ও কালা মোহাম্মদ মিয়ানমারে থাকে। ইয়াবার চালান নিয়ে কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসে এবং চট্টগ্রামে প্রায়ই আসা যাওয়া করে। নগরীর কালামিয়া বাজার এলাকায় কালা মোহাম্মদের একটি ভাড়া বাসা আছে। মো. আলম এ দেশীয় নাগরিক, সীতাকুন্ড উপজেলার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী। সেলিমকে জিজ্ঞাসাবাদে আলমের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ডিবি পরিদর্শক ইলিয়াস। তিনি বলেন, সেলিম আলমের এজেন্ট। আলম টাকা দেয়, সেলিম হানিফ ও কালা মোহাম্মদের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা চট্টগ্রাম নগরীতে নিয়ে আসে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া কয়েকজন রোহিঙ্গা নাগরিককে তারা বাহক হিসেবে ব্যবহার করে। নিয়াজ, আইয়ূব আলী বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ আজাদীকে বলেন, রোহিঙ্গাদের ইয়াবার পাচারের সময় ধরা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মূল ক্রেতা ও বিক্রেতারা। গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পরও মূল হোতাদের ব্যাপারে মুখ খুলে না তারা। এটা তাদের কৌশল হতে পারে। পাশাপাশি এটাও সত্য যে, তাদের ব্যবহার করা হয় ‘কাট আউট’ পদ্ধতির মাধ্যমে। যে কারণে তাদের হাতে যারা ইয়াবা তুলে দেয় তার সম্পর্কে অল্প কিছু জানলেও, এর উপরের রাঘব বোয়ালদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারে না তারা। এজন্য রোহিঙ্গাদের সহজে ব্যবহার করছে এসব ইয়াবা গডফাদাররা। রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করার আরো একটি কারণ রয়েছে। এ দেশীয় কাউকে এ কাজের জন্য হয়তো দিতে হতো ৫ হাজার টাকা। সেখানে রোহিঙ্গা যুবককে ২ হাজার টাকা দিলেই হয়।
এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ আজাদীকে বলেন, মূলত ভয়ের কারণেই তারা তথ্য দিতে চায় না। মূল হোতাদের ব্যাপারে তথ্য না দেয়ার কারণ, তাদের মেরে ফেলার ভয় দেখায় গডফাদাররা। আবার অনেকেই জানে গ্রেফতারের পর তাদেরকে ছাড়িয়ে নেয়া হবে। মূলত আইনশৃক্সখলা রক্ষাকারী বহিনীর চোখ ফাঁকি দিতেই তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।