মাদক, মানবপাচার ও চোরাচালানের পর এবার কক্সবাজারের নতুন উদ্বেগের নাম অনলাইন জুয়া। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক এখন ছড়িয়ে পড়ছে জেলার বিভিন্ন এলাকায়।
সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন এ জুয়ায়। কেউ হারাচ্ছেন লেখাপড়া, কেউ ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, আবার কেউ জড়িয়ে পড়ছেন চুরি-প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধে।
গত ২০ জুলাই টেকনাফে বিজিবির অভিযানে একটি অনলাইন জুয়াচক্রের ৯ সদস্য আটকের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে মাস্টার এজেন্ট, এজেন্ট ও সাব-এজেন্টের সমন্বয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে অনলাইন জুয়ার আসর থেকে তিন রোহিঙ্গাসহ ৯ জন গ্রেপ্তার
অনলাইন প্রতারকচক্র ভুয়া বেটিং অ্যাপ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা
সেই নেটওয়ার্কের প্রভাব এরই মধ্যে কক্সবাজার শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে ভুয়া অনলাইন জুয়ার অ্যাপস খুলেও সংঘবদ্ধ চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালকে কেন্দ্র করে বিজিবির অভিযান : গত ২০ জুলাই গভীর রাতে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের ডেইলপাড়া ও মণ্ডলপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ৯ জনকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৯টি মোবাইল ফোনসেট জব্দ করা হয়।
টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, প্রায় তিন মাস ধরে গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান এবং তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে চক্রটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬-এর ফাইনালকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের অর্থে অনলাইন বেটিং পরিচালনার প্রস্তুতির তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালানো হয়।
অনুসন্ধানে যা মিলল :
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে তিন স্তরের একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একাধিক সূত্রের দাবি, নেটওয়ার্কটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মে খেলোয়াড় যুক্ত করা, অর্থ লেনদেন এবং কমিশনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। সাধারণ রোহিঙ্গা এবং আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিতরা জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়ার কারণেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অপরাধপ্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে।
ভুয়া বেটিং অ্যাপ :
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে একটি প্রতারকচক্র ভুয়া বেটিং অ্যাপ তৈরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রথম দিকে সামান্য লাভ দেখিয়ে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন করা হলেও পরে বড় অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়ার পর অ্যাপ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত আর্মস ব্যাটালিয়ন পুলিশ-এপিবিএন-১৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মো. সিরাজ আমিন বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন অনলাইন জুয়ায় ভাসছে।’
ক্যাম্প ছাড়িয়ে শহরেও ভয়াল থাবা :
অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখন শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ নেই। কক্সবাজার শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায়ও এই জুয়ার নেশা ছড়িয়ে পড়েছে। সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে অনেক কিশোর, তরুণ ও বিভিন্ন পেশার মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া এলাকার বাসিন্দা আলী (ছদ্মনাম) অনলাইন জুয়া নিয়ে অকপটে বলেন, তিনি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক জনপ্রিয় তারকার ভিডিও দেখতে গিয়ে একটি অনলাইন বেটিং অ্যাপ ডাউনলোড করেন। শুরুতে অল্প টাকায় খেললেও পরে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়েন।
পর্যটন খাতেও প্রভাব :
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ আসক্তি শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পর্যটন খাতেও। তিনি দাবি করেন, অনলাইন জুয়ার কারণে কক্সবাজারের বেশ কয়েকটি হোটেলের ম্যানেজার আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এমনকি তাঁর জানা মতে অন্তত একটি হোটেলের মালিকও দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। পর্যটন এলাকায় চলাচলকারী চাঁদের গাড়ির অনেক চালকও এই নেশায় জড়িয়ে পড়েছেন। সুত্র,কালের কণ্ঠ