রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে বিচার পাওয়ার সুযোগ পাবেন শরণার্থীরা। এতে দূরের আদালতে যাতায়াতের ভোগান্তি ও ক্যাম্প পার হওয়ার প্রতিবন্ধকতা অনেকটাই কমবে। শুধু রোহিঙ্গা নাগরিকরা নন, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার বাসিন্দারাও এই সুবিধা পাবেন। বিচার ব্যবস্থা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নেওয়া এ উদ্যোগে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ও ঝুঁকি কমার পাশাপাশি দ্রুত বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়বে।
অপহরণের ঘটনায় করা এক মামলায় নারী ও শিশু আদালতের ভার্চুয়াল শুনানির মধ্যদিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও কক্সবাজার-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ, নিরাপদ ও কার্যকর করতে এই কার্যক্রম চালু হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২ এ (পশ্চিম)- সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদেমুল কায়েস, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মঞ্জুরুল হোসেন, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া, জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা অভিজিৎ চৌধুরী এই ভার্চুয়াল কোর্ট কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় রোহিঙ্গা বিচারপ্রার্থীরা এবং ইউএনএইচসিআর ও ব্লাস্টের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্গম এলাকা থেকে আদালতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীদের যে ভোগান্তি ও ঝুঁকি, ভার্চুয়াল শুনানি মাধ্যমে তা অনেকটাই কমানো সম্ভব। বর্তমান আইন সংশোধন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও মনে করেন তারা।
তাদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় বিচারপ্রার্থীদের আদালতে যাতায়াতের দীর্ঘপথ, চেকপোস্টের বিলম্ব এবং চলাচলের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের আদালতে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও কিছু ক্ষেত্রে কমবে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বিচারিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভার্চুয়াল শুনানির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বিচারক, আইনজীবী ও আদালত কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং বিচারিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা ও ন্যায্যতা বজায় রাখা জরুরি। ধাপে ধাপে ই-জুডিসিয়ারি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বিচারপ্রাপ্তির বিদ্যমান বাধা কমাতে এবং বিচারসেবা আরও সহজলভ্য করতে সহায়তা করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে দেশের আদালতগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে বিচারিক কার্যক্রম সচল রাখার জন্য সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইন প্রণয়ন করে। পরে এই আইনের ৫ ধারার অধীনে সুপ্রিম কোর্ট একটি প্র্যাকটিস ডিরেকশন জারি করে। এর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ অধস্তন আদালতগুলোর ভার্চুয়াল বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি ও পরিবর্তন করতে পারে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই এ বিষয়ে একটি নতুন প্র্যাকটিস ডিরেকশন জারি করা হয়েছে।’
আরও পড়ুন প্রচলিত নাকি ভার্চুয়াল কোর্ট চলবে, কী মত আইনজীবীদের?
এই প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনেকাফে বসবাসরত রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিচারিক সেবা সহজলভ্য করা। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় (আরআরসি) এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ভৌগোলিক দূরত্ব, নিরাপত্তাজনিত সমস্যা কিংবা অন্যান্য বাস্তব ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার কারণে যারা সহজে আদালতে উপস্থিত হতে পারেন না, তাদের বিচারিক সেবার আওতায় আনা।
গত ১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২ (পশ্চিম)-তে এই ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়/ছবি: জাগো নিউজ
রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থার গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। ক্যাম্প থেকে আদালতে যেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আবার ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি, পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং মাদক, অস্ত্র বা হত্যার মতো বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্তদের সশরীরে আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাস্তব সমস্যা রয়েছে। ফলে ভার্চুয়াল আদালত এসব ক্ষেত্রে একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
রিমোট পয়েন্ট ও ভার্চুয়াল সাক্ষ্যগ্রহণ
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থায় সাধারণত একটি ‘রিমোট পয়েন্ট’ নির্ধারণ করা হয়। এটি হতে পারে কোনো লিগ্যাল এইড অফিস, ক্যাম্পের নির্দিষ্ট অফিস বা অন্য কোনো উপযুক্ত স্থান। সাক্ষী, ভিকটিম কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই রিমোট পয়েন্টে উপস্থিত থাকেন এবং বিচারক আদালতকক্ষে বসে অডিও-ভিডিও প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। এ ব্যবস্থায় বিচারক ও আদালতের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পরস্পরকে দেখতে ও শুনতে পারেন। প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তিও হাইকমিশন বা দূতাবাসের মাধ্যমে একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাক্ষ্য দিতে পারেন।
আইনি অধিকার ও এসওপির প্রয়োজনীয়তা
হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের আইনি পরিভাষায় সাধারণত ‘রিফিউজি’ না বলে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক’ (এফডিএমএন) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থানকালে তারা কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে দেশের সার্বভৌম বিচারব্যবস্থার অধীনেই তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন।
বান্দরবানের আলীকদমের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা নদীভাঙন কবলিত চরাঞ্চলের মানুষকে দূরবর্তী আদালতে যাতায়াতের কষ্ট ও ব্যয় থেকে অনেকাংশে মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভার্চুয়াল আদালত বিচারিক সেবাকে আরও সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত করার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।- মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, রেজিস্ট্রার জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট
‘তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তাদের বিচারপ্রক্রিয়ায় নাগরিকদের মতো একই ধরনের আইনি সুযোগ-সুবিধা কতটা প্রযোজ্য হবে এবং জামিনসহ অন্যান্য অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। এসব বিষয় স্পষ্ট করার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একটি সুস্পষ্ট এসওপি থাকলে ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের অধিকার, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।’ বলেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল।
দুর্গম এলাকার মানুষের জন্যও সুযোগ
ভার্চুয়াল আদালতের সুবিধা শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের বিচারিকসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল।
আরও পড়ুন ভার্চুয়াল কোর্টে কোনো সমস্যা দেখছেন না অ্যাটর্নি জেনারেল
তিনি বলেন, ‘বান্দরবানের আলীকদমের মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা নদীভাঙন কবলিত চরাঞ্চলের মানুষকে দূরবর্তী আদালতে যাতায়াতের কষ্ট ও ব্যয় থেকে অনেকাংশে মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ভার্চুয়াল আদালত বিচারিক সেবাকে আরও সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত করার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’
প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি সহজ করতে ভার্চুয়াল শুনানির গুরুত্ব এবং আইনগত সহায়তা, সুরক্ষা সেবা ও বিচারব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি ও ব্লাস্টের প্রধান আইন উপদেষ্টা বিচারপতি বোরহানউদ্দিন।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভার্চুয়াল শুনানি প্রচলিত বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ ও কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ ধরনের উদ্যোগকে টেকসই করতে আইনগত সহায়তা, সুরক্ষা সেবা, আদালত ও প্রযুক্তির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।’
তবে স্পষ্ট নীতিমালা এবং এসওপি প্রণয়ন, ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের উপযুক্ত আইনি কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েস। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভার্চুয়াল শুনানির কার্যকর ও টেকসই বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা আদর্শ কার্যপ্রণালি (এসওপিএস), ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবহারের উপযুক্ত আইনি কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।’
রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত বিচারপ্রার্থীদের আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং কার্যকর রেফারেল ও সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, ‘ক্যাম্প, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনগত সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা ও আদালতের মধ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নারী, শিশু ও বিশেষ সুরক্ষা প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষায়িত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইনগতভাবে আপসযোগ্য বিরোধে প্রশিক্ষিত মধ্যস্থতার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে; তবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থাই কার্যকর থাকতে হবে।’
আরও পড়ুন ভার্চুয়াল কোর্ট প্রত্যাহার না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি আইনজীবীদের
বিচারব্যবস্থায় মামলার জট এবং দূরবর্তী এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘উখিয়া-টেকনাফসহ দূরবর্তী এলাকার বিচারপ্রার্থীদের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে ভার্চুয়াল শুনানির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দূরবর্তী এলাকায় বিচারসেবা আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ বিচারপ্রাপ্তির বাধা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
অনুষ্ঠানে বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে দূরত্ব ও নিরাপত্তাজনিত বাধা এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইজেন বলেন, বিচারপ্রাপ্তি সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দূরত্ব, নিরাপত্তাহীনতা বা অন্যান্য বাস্তব বাধার কারণে কোনো শরণার্থী বা দূরবর্তী এলাকার মানুষ অবিচারের শিকার হবে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপদ, গোপনীয় ও সবার জন্য সহজলভ্য উপায়ে এবং প্রচলিত বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রযুক্তির ব্যবহার এসব বাধা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা/ছবি: জাগো নিউজ
ভার্চুয়াল শুনানির কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যালোচনা এবং এসওপি উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন। ব্লাস্টের উপদেষ্টা আহমাদ ইব্রাহীমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কার্যক্রমের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন ব্লাস্টের পরিচালক (আইন) মো. বরকত আলী।
দূরবর্তী এলাকা, বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো জায়গা (টেকনাফের ক্যাম্পগুলো আদালত থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে) থেকে সাক্ষী আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং কঠোর চেকিংয়ের ঝামেলা থাকে। ভার্চুয়াল পদ্ধতি এই ঝুঁকি কমায় এবং রোহিঙ্গাদের স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, তাও রোধ করে।- ইশরাত হাসান আইনজীবী
ভার্চুয়াল উপস্থিতি ও সাক্ষ্যগ্রহণ
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের প্রধান দিকগুলো নিয়ে মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইনের নতুন সংশোধনীতে ভিডিও কনফারেন্সিং এবং ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ফরেনসিক এভিডেন্স এবং অডিও-ভিডিওর মতো ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণও এখন আদালতে গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
দ্রুত বিচার ও সময় সাশ্রয়
এই কার্যক্রমের মাধ্যমে সাক্ষীকে শারীরিকভাবে আদালতে উপস্থিত না করেও দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হচ্ছে, যা বিচারিক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এতে যাতায়াতের সময় এবং খরচ উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
নিরাপত্তা ও ঝুঁকি হ্রাস
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘দূরবর্তী এলাকা, বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো জায়গা (টেকনাফের ক্যাম্পগুলো আদালত থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে) থেকে সাক্ষী আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং কঠোর চেকিংয়ের ঝামেলা থাকে। ভার্চুয়াল পদ্ধতি এই ঝুঁকি কমায় এবং রোহিঙ্গাদের স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, তাও রোধ করে।’
সুবিধাবঞ্চিত ও সংবেদনশীল সাক্ষীদের সুরক্ষা
নারী, শিশু, অসুস্থ এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আদালতে আসা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা নিজ অবস্থান থেকেই সাক্ষ্য দিতে পারেন, যা তাদের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক ও গুরুত্বপূর্ণ।
আসামিদের হাজিরা ও আধুনিকায়ন
যদি আসামিদেরও কারাগার থেকে ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে হাজিরা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তবে যাতায়াত খরচ ও ঝুঁকি আরও হ্রাস পাবে। সামগ্রিকভাবে, এই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আদালতের কার্যক্রমকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলবে বলে জানান আইনজীবী ইশরাত হাসান।
রোহিঙ্গাদের জন্য ক্যাম্প থেকেই ভার্চুয়াল আদালতে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ব্লাস্টের পরিচালক (পরামর্শ ও যোগাযোগ) ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবা আক্তার জুই জাগো নিউজকে বলেন, ‘কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আদালতে যাতায়াতের নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ভার্চুয়াল শুনানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে ক্যাম্পে অবস্থান করেই বিচারপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবেন বিচারপ্রার্থীরা।’
আরও পড়ুন ভার্চুয়ালি সুপ্রিম কোর্টে ১১৭৪ মামলার শুনানি, নিষ্পত্তি ৪০৯
তার মতে, ‘ক্যাম্প থেকে আদালতে যেতে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত নানা সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষ করে নারী বিচারপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে চলাচল, নিরাপত্তা ও বিভিন্ন অনুমতির বিষয়টি জটিলতা তৈরি করে। ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে এসব ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এতে ক্যাম্প থেকেই আদালতের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে। একই সঙ্গে সময় ও যাতায়াত খরচও কমবে।’
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থার ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভার্চুয়াল শুনানির ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা চলছে বলে জানান ব্লাস্টের পরিচালক।
উখিয়ায় একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প/ফাইল ছবি
তিনি বলেন, ‘বিচারপ্রার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে আদালতের কার্যক্রমে ভার্চুয়াল প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভার্চুয়াল শুনানির জন্য ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্তত একটি ক্যাম্পে এ ধরনের ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ কেন?
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জেলা বিচার বিভাগ, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় (আরআরআরসি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং ব্লাস্টের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে শরণার্থীদের আদালতে বিচারপ্রাপ্তির প্রধান সমস্যাগুলো সম্পর্কে প্রতিকারের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। পরে বিচার বিভাগ, আরআরআরসি, সরকারি কৌঁসুলি, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, ইউএনএইচসিআর, ব্র্যাক ও ব্লাস্টের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ভার্চুয়াল শুনানি, সম্ভাব্য চৌকি আদালত, সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সিআইসি কার্যালয়কে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৫ ধারায় শরণার্থীদের সশরীরে উপস্থিতি থেকে অব্যাহতি দেওয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় পর্যায়ের কর্মশালায়ও উখিয়া-টেকনাফে ভার্চুয়াল শুনানি এবং আদালত ও আইনগত সহায়তা সেবা আরও সহজলভ্য করার বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে ব্লাস্ট এবং ইউএনএইচসিআর এসব আলোচনা থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়। কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উখিয়া-টেকনাফ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এর মাধ্যমে কার্যক্রমটি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর বিষয়ে সম্মতি দেন।
এরপর গত ১৭ জুন ব্লাস্ট, ইউএনএইচসিআর এবং আরআরআরসি’র ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় সভায় শিবির ভিত্তিক দূরবর্তী শুনানি কেন্দ্র চালুর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৮ জুলাই সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ অনুযায়ী একটি পরীক্ষামূলক ভার্চুয়াল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। চার বছর ধরে ওয়ারেন্ট ও অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আটকে থাকা একটি মামলায় ওই শুনানিতে অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হয়।
আরও পড়ুন রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলো মিয়ানমার
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এই কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। উখিয়া ও টেকনাফের দূরবর্তী এলাকার মানুষ আদালতে না গিয়েও নির্দিষ্ট বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এর ফলে স্থানীয় আদালতের ওপর চাপ কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
২০১৯ সাল থেকে ব্লাস্ট ১৭টি রোহিঙ্গা শিবিরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংশ্লিষ্ট ৪৭৪টি মামলায় আইনগত সহায়তা দিয়েছে; এর মধ্যে ৮৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ১০টি মামলা তিন বছরের বেশি সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে এবং এ পর্যায়ে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান অমীমাংসিত মামলাটি সাত বছর ধরে চলমান। ইউএনএইচসিআরের সহায়তায় ব্লাস্ট ও ব্র্যাক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আইনগত সহায়তা প্রদান করছে। এসব অভিজ্ঞতা বিচারপ্রাপ্তির বাধা চিহ্নিত করা এবং ভার্চুয়াল শুনানি কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। সুত্র,জাগো নিউজ