[caption id="attachment_101279" align="alignleft" width="863"]
রোহিঙ্গা ক্যাম্প[/caption]
কয়েক মাস আগে বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা বহনকারী একটি নৌকার বিষয়ে খোঁজ রাখছিল ঢাকার কয়েকটি পশ্চিমা কূটনৈতিক মিশন। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে তাদের সূত্রগুলোর মাধ্যমে প্রায় নিয়মিতই তথ্য পাচ্ছিল তারা। মানবপাচারকারী, দালালচক্র তাদের রোহিঙ্গা শিবিরে আনার জন্য স্বজনদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছিল, তাও অজানা ছিল না কূটনৈতিক মিশনগুলোর অনেকেরই। কিন্তু তার পরও তাঁরা বাংলাদেশ সরকারকে সেসব তথ্য জানাননি। কয়েক দিন পর ওই নৌকার আশ্রয়প্রার্থীদের উদ্ধার করা হলেও তারা সংখ্যায় ছিল অর্ধেকেরও কম।
ওই নৌকার বাকি আরোহী রোহিঙ্গারা কোথায় গেছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, মানবপাচারকারীচক্রের সহযোগিতায় তারা নৌকা ছেড়েছে। সম্ভবত তারা ছোট নৌকায় করে কোনো না কোনোভাবে এ দেশে ঢুকে গেছে।
মানবপাচারকারীচক্র যখন রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসে তখন তা জেনেও নীরব থাকে এ দেশে পশ্চিমা অনেক কূটনৈতিক মিশন। আবার সেই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢোকার পর মানবপাচারকারীদের সহযোগিতায় তাদের অন্যত্র যাওয়া ঠেকাতেও তৎপর তারা। সাম্প্রতিক মাসগুলোর বেশ কিছু ঘটনায় এমনই দ্বৈত ও বিতর্কিত অবস্থান দেখা গেছে তাদের।
ঢাকা ও কক্সবাজারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মানবপাচারকারী ও দালালচক্র টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের এ দেশে আনছে—এমন তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে কূটনৈতিক মিশনগুলোর অনেকের কাছে পৌঁছালেও তাঁরা এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাননা। তবে তাদের আশ্রয় বা উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি হুলুস্থুল ঠিকই বাধান তাঁরা। অনেক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আসাকেই নিরাপদ বলে মনে করেন তাঁরা।
গতকাল সোমবার ২৯৭ জন রোহিঙ্গা একটি নৌকায় করে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ দ্বীপে পৌঁছেছেন। তাঁরা দীর্ঘ সাত মাস সাগরে ভাসার পর আচেহ পৌঁছান। ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ওই রোহিঙ্গাদের কাছে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরের পরিচয়পত্র আছে। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, তারা এ দেশ থেকেই যাত্রা করেছিল। মানবপাচারকারীচক্রের সহযোগিতা ছাড়া তারা এতদূর পথ পাড়ি দিয়েছেন—এমন ভাবনা অবাস্তব। তাদের দীর্ঘ ওই সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার জন্য বড় অঙ্কের অর্থও খরচ করতে হয়েছে।
জানা গেছে, রোহিঙ্গারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে মিয়ানমারে ফিরে গেলে ওই দেশটির সামরিক বাহিনী আবার তাদের নৌকায় তুলে সাগরে ভাসিয়ে দেয়। মূলত এরপরই শুরু হয় দালাল ও মানবপাচারকারী চক্রগুলোর তৎপরতা। তাঁরা রোহিঙ্গাদের এ দেশে আনতে বা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় কোনো দেশে নিয়ে যেতে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মাথাপিছু কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকে। এসংক্রান্ত অনেক তথ্যই পায় পশ্চিমা মিশনগুলো।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের সাগর থেকে উদ্ধার করে নোয়াখালীর ভাসানচরে পাঠিয়েছে। কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ভাসানচরে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে সেখানে রোহিঙ্গা নেতাদের একটি দলকে সরেজমিন পরিদর্শনও করিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি নিয়ে যতটুকু সরব ততটা মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে নয়। এ কারণে মিয়ানমারে সমস্যা সমাধান ও রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি না করে বরং রোহিঙ্গাদের উদ্ধার ও অন্যত্র আশ্রয় দেওয়ার ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।
প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা গতকাল ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলে পৌঁছার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক ইন্দ্রিকা রাতওয়াতে বলেছেন, ওই রোহিঙ্গাদের সঙ্গে একই নৌকায় যাত্রা করা আরো ৩০ জনেরও বেশি পথিমধ্যে মারা গেছে।
তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে সংকটের সময় ‘বালি প্রসেসের’ সদস্য রাষ্ট্রগুলো এই আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্মিলিত ও নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়া চালানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছিল। তবে এ লক্ষ্যে কাজ করতে কাঠামো সৃষ্টির অঙ্গীকার এখনো পূরণ হয়নি। সুত্র: কালেরকন্ঠ