বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে থেকে তিন লাখের কিছু বেশি মানুষকে ফেরত নেওয়ার কথা জানিয়ে মিয়ানমার যে নতুন বিবৃতি দিয়েছে, সেটিকে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন রোহিঙ্গা নেতা সৈয়দ উল্লাহ।
তার মতে, রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকার করে এবং ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে মিয়ানমার কার্যত প্রত্যাবাসন না হওয়ার পথই তৈরি করছে।
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা রিপ্রেজেন্টেটিভের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ উল্লাহ বে ইনসাইট-কে বলেন, “রোহিঙ্গাদেরকে না নেবার জন্য একটা ড্রামা করতেছে উনারা।”
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের ফেরত নেওয়া হবে। তবে বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই।
মিয়ানমারের দাবি, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
আর ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে দেশটি।
মিয়ানমারের এই বক্তব্যের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি বাংলাদেশ।
তবে শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন মনে করেন, মিয়ানমারের বিবৃতিতে একদিকে প্রত্যাবাসনের আগ্রহ দেখানো হলেও অন্যদিকে এমন কিছু শর্ত ও ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
তার মতে, তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো যেতে পারে। কিন্তু এই তিন লাখই যেন পুরো প্রত্যাবাসনের শেষ না হয়, সেটিই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে এখন ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। ফলে তিন লাখ ফেরত নেওয়ার কথা বলা হলে বাকি বিপুল সংখ্যক মানুষের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে মিয়ানমারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া দরকার।
“তারা যদি মনে করেন তিন লাখই আমরা নেব আর বাকিরা এখানকার না, এরকম সিদ্ধান্ত নেয়, আমি মনে করি বাংলাদেশ সরকারের এটা নিয়ে নেগোশিয়েট করার কথা বলা দরকার,” বলেন তিনি।
---
পরিচয় অস্বীকারের প্রশ্ন
---
মিয়ানমারের নতুন বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাহমান নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় স্বীকার করে না, বরং তাদের রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত নেওয়ার কথা বলছে।
“তারা মনে করে না রোহিঙ্গার দেশের নাগরিক। তারা নিয়ে যাবে তারা ওখানকার রেসিডেন্ট,” বলেন তিনি।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে যাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত হচ্ছে, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করাটাও জরুরি।
“একাডেমিক জায়গা থেকে, হিউম্যান রাইটসের জায়গা থেকে দেখলে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে- তারা আসলে যেতে চায় কি না,” বলেন তিনি।
তার মতে, প্রত্যাবাসনের আগে অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন- ফিরে গেলে রোহিঙ্গাদের জীবন ও নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে, মিয়ানমারে তাদের আইনি পরিচয় কী হবে এবং সেখানে তারা মানবিক মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবে কি না।
---
‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি’ হবে কখন?
---
মিয়ানমারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলে যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের গ্রহণ করা হবে।
এই শর্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাহমান নাসির উদ্দিন।
“নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হবে-এটা কবে হবে, কীভাবে হবে, কিসের ভিত্তিতে হবে? এটা কে মাপবে?” প্রশ্ন তার।
তার মতে, মিয়ানমার, আরাকান আর্মি, বাংলাদেশ নাকি জাতিসংঘ, কে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ‘উন্নত’ হয়েছে বলে ঘোষণা করবে, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই।
বর্তমান রাখাইনের বাস্তবতায় বিষয়টির সঙ্গে আরও একটি রাজনৈতিক হিসাব জড়িয়ে থাকতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
রাহমান নাসির উদ্দিনের ভাষায়, রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই আরাকান আর্মির হাতে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের সামরিক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রাখার মাধ্যমে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করতে পারে।
“এর মধ্যে একটা পলিটিক্স আছে। এটাকে আমরা বলি হিডেন পলিটিক্স,” বলেন তিনি।
তবে সেই আশঙ্কার মধ্যেও প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগকে পুরোপুরি নাকচ না করার পক্ষে তিনি।
“আমরা এটাকে স্বাগত জানাই। শুরু হোক,” বলেন এই শরণার্থী বিশেষজ্ঞ।
---
‘পরিবারের একজনকে সন্ত্রাসী বললে যাবে কে?’
---
রোহিঙ্গা নেতা সৈয়দ উল্লাহর আশঙ্কা, মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়াতেই প্রত্যাবাসন আটকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
তার প্রশ্ন, ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্যে যদি মাত্র তিন লাখকে ফেরত নেওয়ার উপযোগী বলে শনাক্ত করা হয় এবং তাদের মধ্যেও কাউকে ‘সন্ত্রাসী’ তালিকায় রাখা হয়, তাহলে একটি পরিবারের অন্য সদস্যরা কীভাবে ফিরবেন?
“একটা ফ্যামিলিতে একজন যদি টেরোরিস্ট লিস্টে থাকে, ফ্যামিলি কি আর কেউ যাবে?” বলেন তিনি।
তার মতে, রোহিঙ্গাদের সংকটের কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে পরিচয়ের প্রশ্ন। মিয়ানমার তাদের রোহিঙ্গা পরিচয় স্বীকার না করায় প্রত্যাবাসনের পরও একই সংকট আবার তৈরি হতে পারে।
“এখন আইডেন্টিটি ডিনাই করে আমরা সেখানে যাওয়ার সময়... দুই বছর, তিন বছর পর আবার তো বাংলাদেশে আসা লাগবে,” বলেন তিনি।
---
‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি ৫০ বছরেও স্থিতিশীল হবে না’
---
মিয়ানমারের ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি’ শর্তকেও প্রত্যাবাসনের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সৈয়দ উল্লাহ।
“আমরা তো মনে করি কন্ডিশন আগামী ৫০ বছরেও এরকম স্টেবল হইতে দিবে না উনারা। এরকম কন্ডিশন উনারা ধরে রাখবে। কীভাবে রিপ্যাট্রিয়েশন হবে?” বলেন তিনি।
তার মতে, গত নয় বছর ধরে মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের কথা বলে এলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।
“রিপ্যাট্রিয়েশন করবে, করবে, করবে, কোন সময় কি রিপ্যাট্রিয়েশন ইমপ্লিমেন্ট হইছে? হয় নাই,” বলেন তিনি।
---
‘মডার্ন ভিলেজ’ নিয়ে আপত্তি
---
২০১৮ সালের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমঝোতার প্রসঙ্গ টেনে সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের কোথায় রাখা হবে, সে বিষয়টিও তাদের উদ্বেগের।
তার দাবি, মিয়ানমারের পরিকল্পনায় ‘অরিজিনাল হোমল্যান্ড অর নিয়ারেস্ট অব ইট’ অর্থাৎ আদি বসতভিটা বা তার কাছাকাছি এলাকায় রাখার কথা বলা হলেও ‘মডার্ন ভিলেজ’ নামে এমন কিছু স্থাপনার পরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলোর চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া থাকবে।
এ ধরনের ব্যবস্থাকে তিনি ক্যাম্প বা আটককেন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করেন।
“মিয়ানমারে যখন এরকম ক্যাম্প হবে এটাকে বলা যাবে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা ডিটেনশন সেন্টার,” বলেন তিনি।
সিত্তে এলাকায় ২০১২ সাল থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করছে বলেও দাবি করেন এই রোহিঙ্গা নেতা।
---
নাগরিকত্বের পথও প্রশ্নের মুখে
---
মিয়ানমারের নাগরিকত্বের ‘পাথওয়ে’ নিয়েও আপত্তি রয়েছে বলে জানান সৈয়দ উল্লাহ।
তার ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড বা এনভিসি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নিতে গেলে তারা নাগরিকের বদলে ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
“রোহিঙ্গাদেরকে নেওয়া লাগলে রোহিঙ্গারা অটোমেটিকলি ফরেনার হয়ে যাবে,” বলেন তিনি।
এই কারণে তার মতে, মিয়ানমার একদিকে বলবে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায়, অন্যদিকে এমন শর্ত দেবে যাতে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাই তৈরি না হয়।
---
‘বাংলাদেশ এককভাবে এই তথ্য তৈরি করেনি’
---
মিয়ানমারের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান।
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাঙালি বলতেই পারে, এটা তাদের ডেফিনেশন। আমাদের ডেফিনেশন আবার রোহিঙ্গারাও তাদের নিজেদেরকে বাঙালি মনে করে না।”
মিয়ানমার কোন তথ্যের ভিত্তিতে এ দাবি করছে, তা বাংলাদেশের জানা নেই বলেও জানান তিনি।
মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছিল। সেই জনগোষ্ঠীর পরিবার ও সদস্য সংখ্যা পরবর্তী সময়ে বেড়েছে।
“আমাদের এখানে এখন ১২ লাখের উপরে রোহিঙ্গা বসবাস করছে,” বলেন তিনি।
এই তথ্য বাংলাদেশ এককভাবে তৈরি করছে না জানিয়ে শরণার্থী কমিশনার বলেন, “এটা একটা জয়েন্ট ভেরিফিকেশন এক্সারসাইজ। বাংলাদেশ এবং ইউএন, দুই পক্ষই একসাথে করে। সুতরাং এটা তো আমাদের একক কোনো ডেটা না।”
মিয়ানমারের নতুন বিবৃতিতে তিন লাখের কিছু বেশি মানুষকে ফেরত নেওয়ার কথা বলা হলেও, সেটি এখনও বাংলাদেশকে দেওয়া কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
রাহমান নাসির উদ্দিনের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মিয়ানমার বাস্তবে কতজনকে, কী শর্তে এবং কোন নিশ্চয়তায় ফেরত নিতে প্রস্তুত, তা স্পষ্ট করা।
কারণ, নয় বছর ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটে প্রত্যাবাসনের ঘোষণা কম হয়নি, কিন্তু নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এখনও শুরু হয়নি।