নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহজলভ্যতা ও অনলাইন শপিংয়ের সুবিধার আড়ালে ভয়াবহ এক অনিয়মের চিত্র ভেসে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘দারাজ’-এ। নিষিদ্ধ তরল মাদক বিক্রির অভিযোগে ইতোমধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মামলার মুখোমুখি হওয়া এই প্ল্যাটফর্মে এবার প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে গাঁজা সেবনের কলকি বা সরঞ্জাম, অনিবন্ধিত যৌন উত্তেজক ওষুধ এবং ছদ্মবেশী নানাবিধ ক্ষতিকর সামগ্রী।
ই-কমার্স নীতিমালার তোয়াক্কা না করে কোনো প্রকার অ্যালগরিদম ফিল্টারিং ও পণ্যের যাচাই-বাছাই ছাড়াই একের পর এক অবৈধ পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি চলায় প্ল্যাটফর্মটির নৈতিকতা ও আইনি দায়বদ্ধতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ছদ্মবেশে গাঁজার সরঞ্জাম ও মাদক সেবনের অনুষঙ্গ
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দারাজে সরাসরি গাঁজা ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উন্মুক্ত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে। তামাক বা গাঁজা সেবনে বহুল ব্যবহৃত মাটির কলকিকে অ্যালগরিদম ও আইনি নজরদারি এড়াতে ‘Soil Flute Made by Pure Clay’ (মাটির তৈরি বাঁশি) নামে ক্যাটালগভুক্ত করা হয়েছে
১৮৫ টাকায় বিক্রি হওয়া এই পণ্যটির বিস্তারিত অপশনে তাকালে দেখা যায়, মাটির তৈরি কলকির পাশাপাশি কাঠ ও শিং দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ডিজাইনের পাইপ ও মাদক সেবনের সরঞ্জামও অপশন হিসেবে রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ক্যাটালগে ‘এয়ার ফ্রেশনার’ বা ‘এসেনশিয়াল ওয়েল’-এর নামে উচ্চমাত্রার ক্যানাবিস নির্যাস (টিএইচসি) এবং প্রসাধন সামগ্রীর ছদ্মবেশে নিষিদ্ধ তরল মাদক বিক্রির প্রমাণও ইতোমধ্যে পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।
বেপরোয়া যৌন উত্তেজক ওষুধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
শুধুমাত্র মাদক বা সেবনের অনুষঙ্গই নয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনহীন ও অনিবন্ধিত শত শত দেশি-বিদেশি যৌন উত্তেজক ওষুধ ও কেমিক্যালও দেদারসে বিক্রি হচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মে। কোনো প্রকার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বা ফার্মাসিউটিক্যাল যাচাই ছাড়াই ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ বা ‘হার্বাল প্রোডাক্ট’-এর ট্যাগ লাগিয়ে এসব স্পর্শকাতর কেমিক্যাল বিক্রি করা হচ্ছে, যা তরুণ সমাজের মধ্যে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
অনলাইন ট্র্যাকিং ও ডিএনসির ডিজিটাল মামলা
সম্প্রতি দারাজের লোগোযুক্ত প্যাকেট ব্যবহার করে সিবিডি অয়েল ও অ্যারোমেটিক অয়েলের নামে তরল মাদক বিক্রির অভিযোগে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
ফাঁদ ও গ্রেপ্তার: ক্রেতা সেজে দারাজে অর্ডার দিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকা মূল্যের ৬২০ মিলিলিটার তরল ‘টিএইচসি’ উদ্ধার করে ডিএনসির একটি আভিযানিক দল। পরবর্তীতে জড়িত মূল কেমিস্টকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঐতিহাসিক মামলা:ডিজিটাল সাইবার স্পেস ব্যবহার করে মাদক বিক্রির অভিযোগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাড্ডা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় দারাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সহ জড়িত সেলার ও সংশ্লিস্টদের আসামি করা হয়।
ভীতিজনক তথ্য: তদন্তকারীদের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে নজরদারির বাইরে থেকে এই প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে চার শতাধিক বোতলেরও বেশি এই বিপজ্জনক তরল মাদক বিক্রি করা হয়েছে।
ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা
একটি দায়িত্বশীল ই-কমার্স জায়ান্ট হিসেবে থার্ড-পার্টি সেলারদের (Third-party Sellers) পণ্য তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যে কঠোর মনিটরিং ও ‘কী-ওয়ার্ড ফিল্টারিং’ (Keyword Filtering) থাকার কথা ছিল, দারাজের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি অনুপস্থিত। ছদ্মবেশী নাম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে কীভাবে মাদক ও যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি হচ্ছে, তা নিয়ে ই-কমার্স খাতের বিশেষজ্ঞরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সেলারের ওপর দায় চাপিয়ে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পণ্যের নাম ও উদ্দেশ্য যাচাই না করে কোটি কোটি গ্রাহকের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় ধরণের গাফিলতি এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
দারাজের দায় এড়ানোর বক্তব্য
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অবৈধ পণ্য ও নিষিদ্ধ তরল মাদক বিক্রির গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর বরাবরের মতোই দায় এড়ানোর চেনা বক্তব্য দিয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ‘দারাজ বাংলাদেশ’। তবে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতির কথা জানালেও, বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংবাদ প্রকাশের ঠিক আগ মুহূর্তেও দারাজের প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ্যে বিক্রি হতে দেখা গেছে মাদক সেবনের নানা সরঞ্জাম।
এ ব্যাপারে দারাজ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রচলিত আইন মেনে চলা এবং গ্রাহকের আস্থাকে দারাজ বাংলাদেশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট পণ্যটি তাৎক্ষণিকভাবে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং নীতিমালার আলোকে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দারাজ। একই সাথে, প্ল্যাটফর্মে অনুরূপ কোনো পণ্য রয়েছে কি না, তা শনাক্ত ও অপসারণ করতে নিয়মিত নজরদারি ও যাচাই কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলেও দারাজ জানিয়েছে। সুত্র, টেকজুম