
সব দ্বিধা কাটিয়ে নোয়াখালীর ভাসানচরের ভয়হীন জীবনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন সেখানে স্থানান্তরিত সাড়ে সাত হাজারের মতো রোহিঙ্গা। ক্যাম্পের আবদ্ধ জীবনের চেয়ে ভাসানচরে জীবনযাপনের অবারিত সুযোগ-সুবিধা পেয়ে রোহিঙ্গারা খুবই খুশি। কারণ ভাসানচরের নতুন ঠিকানায় প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবার পেয়েছে আলাদা ঘর, রান্নার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, পানি আর পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা।
সঙ্গে আছে খেলার মাঠ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, এমনকি জীবিকা নির্বাহের সুযোগও। তবে এত সুবিধার পরও রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চান তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে। বাংলাদেশ সরকারও আশা করে অস্থায়ীভাবে ভাসানচর ও টেকনাফ-উখিয়ার ক্যাম্পগুলোতে থাকা রোহিঙ্গাদের অচিরেই ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার।
ভাসানচরে বসবাসরত ৩২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা মোতালেব হোসেন বলেন, যদি নিরাপত্তা ও অধিকার ফিরে পাই, তা হলে রাখাইনে ফিরতে চাই। কারণ আমার সব কিছু সেখানে। ৪৮ বছরের হাফিজ মোল্লা বলেন, কক্সবাজারের ঝুপড়িঘরের পরিবর্তে তারা ভাসানচরে খোলামেলা জায়গা ও সুরক্ষিত ঘরবাড়ি পেয়েছেন।
তাই কক্সবাজারে থাকা তার আত্মীয়দেরও ভাসানচর আসার জন্য বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, ভাসানচরে আসার জন্য নাম তালিকাভুক্ত করবে। তবে নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা পেলে হাফিজও ফিরতে চান রাখাইনে। তিনি বলেন, সেখানে আমার জমি, ঘর, দোকান সব কিছু আছে।
ভাসানচরে এসে ২৬ বছরের সোলায়মান মালয়েশিয়ায় থাকা ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে খাবার হোটেল দিয়েছেন বেশ কয়েক দিন হলো। ভাসানচরের পরিবেশ সুবিধা দেখে খুব খুশি তিনিও। সোলায়মানের হোটেলে চা ও নাস্তা পাওয়া যায়। এখনো সেভাবে আয় শুরু না হলেও খুব তাড়াতাড়ি লাভের মুখ দেখবেন বলে আশাবাদী তিনি। তবু সোলায়মান ফিরতে চান তার মাতৃভূমিতে। তিনি বলেন, আমাদের রাখাইনে দোকান ছিল। যদি আমাদের নিরাপত্তাসহ সব দাবি মিয়ানমার মেনে নেয়, তা হলে আমরা রাখাইনে ফিরে যাব।
ভাসানচর প্রকল্পের পরিচালক কমোডর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, এটি সম্পূর্ণ অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোই আমাদের মূল লক্ষ্য। এখানে স্থানান্তরিতদের মধ্যে চার থেকে ১৪ বছরের শিশু বেশি। এখানে যে স্থাপনা এবং অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা আছে, এ ধরনের সুবিধার কথা শুনে অনেকে আসছেন। আমি
সম্প্রতি ট্রিপল আরসির (শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনবিষয়ক কমিশনার) সঙ্গে বৈঠক করেছি। তিনি জানিয়েছেন, অনেকে আসতে চাইছেন। আমার ধারণাÑ আমাদের যে স্থাপনা ও সুবিধাগুলো আছে, সেগুলোর জন্য তারা অনেক ভালো আছে।
কক্সবাজারে ছয় হাজার ৫০০ একর জায়গায় পালিয়ে আসা মোট ১১ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। কিন্তু ভাসানচরে ১৭০০ একর জায়গায় এক লাখ রোহিঙ্গার বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিয়ে কমোডর আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা ১৯ ফুট উঁচু বাঁধ দিচ্ছি। বাঁধের মধ্যে যে জায়গা আছে, সেখানে নতুন স্থাপনা তৈরি করা হলে আরও দুই লাখ রোহিঙ্গা আনা সম্ভব। নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কক্সবাজারে যেভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, সেভাবেই এখানে দেওয়া হচ্ছে। এরা যদি বিভিন্ন পেশাভিত্তিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয় তা হলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াবে না।
এদিকে নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার জানান, গতকাল রবিবার আরও ২০১৪ রোহিঙ্গাকে নিয়ে ৩৯টি বাস ভাসানচরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। দুপুরে দুই ধাপে তারা উখিয়া ডিগ্রি কলেজের অস্থায়ী ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। সঙ্গে ১১টি কাভার্ডভ্যানে যাচ্ছে স্থানান্তরিতদের মালামাল।
জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় ২২টি ও বিকাল ৩টায় আরও ১৭টি বাস চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। চট্টগ্রামে পৌঁছার পর নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আজ তাদের জাহাজে করে ভাসানচরে নেওয়া হবে। কক্সবাজারে অবস্থিত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অফিসের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শামসুদ দৌজা নয়ন জানিয়েছেন, আজ উখিয়া থেকে আরও হাজার দেড়েক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরের উদ্দেশে পাঠানো হবে। সুত্র: আমাদের সময়